যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আর মাত্র তিন মাস। এমন সময়ে কি প্রতিযোগিতার দৌড় থেকে ছিটকে পড়বেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন? তিনি বাদ পড়লে কে হবেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী? গত বৃহস্পতিবার ২৭ জুন প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে বাইডেনের বাজে পারফরম্যান্সের পর এসব প্রশ্নই ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশটির রাজনৈতিক মহলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, প্রথম বিতর্কে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কার্যত হেরে গেছেন জো বাইডেন।
দ্য পলিটিকোর খবর অনুসারে, বাইডেনকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে প্রার্থী করা যায় কি না, তা নিয়ে এক সময় ডেমোক্র্যাট শিবিরের কেউ টুঁ শব্দ করতেন না। কিন্তু প্রথম বিতর্কের পর এই বিষয়টি নিয়েই তাদের মধ্যে জোরেশোরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বলা হচ্ছে, বাইডেনের ‘আটকে যাওয়া কণ্ঠস্বর’, ‘অস্পষ্ট’ উত্তর এবং পুরো কথা শেষ করতে ‘সংগ্রাম’ করার কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। এ অবস্থায় তার পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রার্থী করার বিষয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছেন তারা। এমনকি, কেউ কেউ বাইডেনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন’ বলেও খবরে দাবি করা হয়েছে। তবে, জো বাইডেন নিজ থেকে সরে না দাঁড়ালে বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।

তবে বিতর্কের পর থেকেই সরব প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানরা। বাইডেন শেষ পর্যন্ত প্রার্থী থাকবেন কি না তা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে বেশি সরব প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানরা। প্রার্থিতার দৌড়ে ট্রাম্পের কাছে হেরে যাওয়া নিকি হ্যালি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে লিখেছেন, আমার কথা লিখে রাখো... বাইডেন ডেমোক্র্যাটদের মনোনীত প্রার্থী থাকবেন না। রিপাবলিকানরা সতর্ক থাকুন!
তাহলে বাইডেনের পরিবর্তে কে? ৮১ বছর বয়সী এ নেতা শেষ মুহূর্তে যদি সত্যিই বাদ পড়েন, তাহলে তার জায়গায় কে লড়বেন? কাকে দেখা যেতে পারে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে? এই জল্পনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্ত্রী মিশেলের নাম। সাবেক এ ফার্স্ট লেডিকে বাইডেনের চেয়ে যোগ্য প্রার্থী বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তাদের মধ্যে একজন টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ।
রিপাবলিকান এই নেতা রীতিমতো ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগস্টে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কনভেনশনেই জো বাইডেনকে প্রতিস্থাপন করা হবে। ক্রুজ তার পডকাস্টে বলেন, ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জো বাইডেনকে সরিয়ে মিশেল ওবামাকে প্রার্থী করবে। কারণ, বিতর্কে বাইডেন এতটাই খারাপ করেছেন যে, সারাদেশের ডেমোক্র্যাটরা আতঙ্কে রয়েছেন।
আলোচনায় আছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও। তবে মার্কিন রাজনীতিতে নারীরা অনেক এগিয়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি কেউই। হিলারির মত শক্ত প্রতিদ্বন্দীকে এর আগে হারিয়েছেন এ ডোনাল্ড ট্রাম্পই। সেখানে মিশেল আর কমলাকে নিয়ে শঙ্কা থাকছেই!

এদিকে, ডোনার বা অর্থদাতাদের রীতিমতো বিপদে ফেলে দিয়েছেন জো বাইডেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথম বিতর্কে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে যে পারফরম্যান্স করেছেন, সেটি কেবল তাঁর প্রচারণাকে ঝুঁকিতে ফেলেনি। তাঁর রাজনীতি যেমন এখন হুমকির মুখে, তেমনি এ বিতর্ক জো বাইডেনের জন্য একটি আর্থিক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এখন জো বাইডেনের তুলনায় বেশি নগদ অর্থ আছে। প্রতি মাসে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী যে পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করছেন, তাতে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্প। বর্তমান প্রেসিডেন্টের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, যদি তাঁর ধনী অর্থদাতারা মনে করেন যে তাঁরা দৌড়ে হারতে থাকা ঘোড়ার ওপর বাজি ধরছেন।
পরিস্থিতি কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে এমন ছিল না। চাঁদা তোলার ক্ষেত্রে জো বাইডেন অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। একের পর এক আইনি ঝামেলা হাত–পা বেঁধে ফেলছিল ট্রাম্পের। অন্যদিকে বাইডেনের ঝানু প্রচারণা বাহিনী তখন ঠিক সেই কাজ করে চলছিলেন, এ ধরনের প্রচারণার ক্ষেত্রে যা করা দরকার-তহবিল সংগ্রহ। কিন্তু স্রোত হঠাৎ করে ঘুরে যায় গত বসন্তে। এপ্রিল মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বর্তমান প্রেসিডেন্টের চেয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি তহবিল সংগ্রহ করে ফেলেন।
এরপর মে মাসে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয় বাইডেনের জন্য। ৩০ মে ট্রাম্প নিউইয়র্কের একটি আদালতে ব্যবসার নথিপত্রে মিথ্যা তথ্য দেয়ার ৩৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ওই ঘটনা তাঁর জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী অর্থভান্ডার রীতিমতো উপচে পড়তে শুরু করে। অনেকটা পিছিয়ে পড়েন জো বাইডেন।
বাইডেন শিবির অবশ্য বলছে যে বিতর্কের পর ভালো চাঁদা আসছে। এটা ঠিক যে বড় যেকোনো টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রার্থীদের জন্য চাঁদা তুলতে সাহায্য করে। কারণ, ছোট চাঁদাদাতারা তখন এ ব্যাপারে মনোযোগ দেন। গণমানুষের কাছ থেকে আসা চাঁদা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাইডেনের তোলা ৪২ শতাংশ চাঁদা এসেছে যাঁরা ২০০ ডলারের কম দিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই হার ৩১ শতাংশ।
সামনের মাসগুলোতে যদি সাবেক প্রেসিডেন্ট চাঁদা তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রেসিডেন্টের তুলনায় এগিয়ে থাকেন, তাহলে ডেমোক্র্যাটদের কাছে এটি হবে একটি ইঙ্গিত যে জো বাইডেনের প্রার্থিতা বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে।
