ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পেহেলগামে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে তোলপাড় ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতি। দিল্লি বলছে, হামলায় জড়িতদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। সঠিক মুহূর্তে সঠিক জবাব দেয়া হবে এবং জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
পেহেলগামে পর্যটক হত্যাকাণ্ডের পর বুধবার রাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচ দফা পদক্ষেপের ঘোষণা করে মোদী সরকার। কয়েকটি সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি স্থগিত করে সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন চুক্তি। রাত পার হতেই ষষ্ঠ পদক্ষেপ। পাকিস্তানের সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টটি ভারতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বৃহস্পতিবার সকালে।
ভারতের সংবাদ ও গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, পাহেলগাম হত্যাকাণ্ডের জেরে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পথে হাঁটার বার্তা দিয়েছে মোদী সরকার। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির পদক্ষেপের জবাব দিতে তৎপর হল ইসলামাবাদ। পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি।

তবে, সব কিছুকে ছাপিয়ে এখন সবখানে আলোচনার তুঙ্গে হামলার দায় নেয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘দ্যা রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ বা টিআরএফ। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি ভারতের গোয়েন্দাদের কাছে পরিচিতি থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এদের কোন কর্মকাণ্ড শিরোনামে আসেনি। পেহেলগামে হামলার আগে গোষ্ঠীটির গতিবিধি ছিলো সীমিত।
এরিমধ্যে হামলায় জড়িত চারজনকে শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। চারজনের ছবি প্রকাশ করে পরিচয় জানানো হয়েছে। এই চার হামলাকারী হলেন- আদিল, আসিফ ফুজি, সুলেমান শাহ এবং আবু তালহা। এদের মধ্যে তিনজনের স্কেচ প্রকাশ করেছে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী।
মঙ্গলবার দুপুরে জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পেহেলগামের বৈসরন উপত্যকায় নির্বিচারে গুলি চালায় বন্দুকধারীরা। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হামলাকারীরা সংখ্যায় ছিলো পাঁচ-ছয় জন। সকলের মুখেই ছিল মাস্ক। হাতে ছিলো একে ৪৭ রাইফেল। আচমকাই পর্যটকদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে সন্ত্রাসীরা।

২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির আবহে জন্ম হয় এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর। পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-ত্যাইয়েবার ‘ছায়া সংগঠন’ হিসাবে উঠে আসে টিআরএফ। পেহেলগামের হামলাকারীরা টিআরএফের সদস্য বলেই দাবি করছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা।
ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত এলাকার মর্যাদা দিয়েছিলো ৩৭০ ধারা। কিন্তু ২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার তা প্রত্যাহার করে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ওই ধারা বাতিলের পর থেকেই টিআরএফ অনলাইনে প্রোপাগান্ডা চালাতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সক্রিয় 'জঙ্গি' সংগঠনে রূপ নেয়।
ভারত সরকার ২০২৩ সালে এই সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। টিআরএফের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের অভিযোগ- এই গোষ্ঠী কাশ্মীরের তরুণ ও যুবকদের দের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে, অনলাইনে উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ায় এবং অস্ত্র চোরাচালানের সাথে জড়িত।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, এটি সম্ভবত লস্করের একটি শাখা, যারা কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেও ইঙ্গিত দিতে চায় যে তারা সক্রিয়। এ ধরনের সংগঠনগুলো যখন কোণঠাসা হয়, তখন তারা পৃষ্ঠপোষকদের কাছে তাদের সক্রিয়তা প্রমাণের জন্য হামলা চালায়।
টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় টিআরএফ বলেছে, দিল্লি সরকারের বহিরাগতদের আবাসনের অনুমোদনের বিরোধিতা করে তারা। যারা এখানে অবৈধভাবে বসতি গড়ার চেষ্টা করবে, তাদের ওপরই সহিংসতা চালানো হবে বলেও ওই টেলিগ্রাম বার্তায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে টিআরএফ।
যদিও মঙ্গলবারের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন পর্যটকেরা। তাদের কেউ-ই কাশ্মীরে নতুনভাবে বসবাস শুরু করা বাসিন্দা ছিলেন না। তবু টেলিগ্রাম বার্তায় টিআরএফের দায় স্বীকার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অবাক করেনি। টিআরএফকে ‘ভার্চ্যুয়াল ফ্রন্ট’ নামে ডাকা হলেও বাস্তবে সক্রিয় হতে পারে ধারণা করছিলেন তারা।
কাশ্মীরের প্রচলিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বেশিরভাগের নামে ইসলামি পরিচয় থাকে। তবে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ নামটি সেই ধারার ব্যতিক্রম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে, এই নামকরণ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করা হয়েছে, যেন গোষ্ঠীটির নিরপেক্ষ চরিত্রের ভাবমূর্তি তৈরি হয়।
২০২০ সাল থেকে টিআরএফ ছোটখাটো কিছু হামলার দায় নিতে শুরু করে। এর ভেতর নির্দিষ্ট লোকজনকে লক্ষ্য করে হত্যা বা টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ছিল। টিআরএফ বিভিন্ন খুচরা বিদ্রোহী সংগঠন থেকে আসা যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত। তখন থেকেই ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো টিআরএফের একাধিক সেল বা গ্রুপ ভেঙে দেয়।
এরপরও গোষ্ঠীটি টিকে থাকে ও শক্তিশালী হতে থাকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের মধ্যে কাশ্মীরে যেসব বন্দুকযুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগই টিআরএফের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরা ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং শুরু করে।

অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যা করে টিআরএফ। চার বছর আগে সাংবাদিকদের একটি হিট লিস্ট করে প্রথম শিরোনামে আসে এই গোষ্ঠী। এরপর ২০২৪ সালের জুনে টিআরএফ জম্মুর রেয়াসি এলাকায় হিন্দু তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি বাসে হামলার দায় স্বীকার করে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভারত সরকার টিআরএফকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের নিয়োগ ও পাকিস্তান থেকে কাশ্মীরে অস্ত্র পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে যত বেশি টিআরএফ যোদ্ধা নিহত হতে থাকেন, ততই তাদের সংখ্যা কমে আসে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তারা সবাই ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলেও বেশিরভাগ সময়ে তাঁরা উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে গোপন আস্তানায় অবস্থান করেন এবং খুবই নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে করে থাকে।
টিআরএফের জন্ম হয়েছিল কাশ্মীরের জঙ্গি শেখ সাজ্জাদ গুলের হাতে। নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী তৈরির আগে গুল ছিলেন লস্করের কমান্ডার। এই সংগঠন তৈরির আগেও মুম্বাই তাজ হোটেলে হামলা এবং সাংবাদিক হত্যাসহ একাধিক সন্ত্রাসের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
লস্কর, জৈশের পাশাপাশি কাশ্মীরিদের নিয়ে গঠিত জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল মুজাহিদিনের দলছুট গোষ্ঠীর কমান্ডার মাইসের আহমেদ দারও পরবর্তীতে শামিল হন টিআরএফে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হন তিনি। কিন্তু ততদিনে টিআরএফ জাল ছড়ায় উপত্যকার গভীরে।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন সাইফুল্লাহ খালিদ ওরফে সাইফুল্লাহ কাসুরি। তিনি লস্করের অন্যতম প্রধান। এ ছাড়াও, এই গোষ্ঠীর অন্যতম মাথা তথা ভরতের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় থাকা হাফিজ সাঈদের ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিতি রয়েছে সাইফুল্লাহ’র।

জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ জানায়, প্রথমে আইইডি বিস্ফোরণের ছক করেছিলো হামলাকারীরা। পরে পরিকল্পনা বদলে দু’টি দলে ভাগ হয়ে যায় তারা। অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে পর্যটকদের উপর হামলা চালায়। বন্দুকধারীরা সবাই সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করেছিল বলেই মনে করছে ভারতের গোয়েন্দারা।
দিন কয়েক আগেই ভারতে আসে বন্দুকধারীরা। এমনকি হামলার জন্য এলাকা পরিদর্শন করে সেটি চূড়ান্তও করে যায়। হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেল। গোয়েন্দাদের ধারণা, লস্কর থেকে এই অস্ত্র শুধুমাত্র হামলায় ব্যবহারের জন্য টিআরএফ’কে দেয়া হয়েছে। হামলার পর রাইফেল ফেরত নিয়েছে লস্কর।
জেলেনস্কির জন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি হচ্ছে না: ট্রাম্প