প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে ভেনেজুয়েলা সরকারের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে, তার আরও একটি স্পষ্ট সংকেত পাওয়া গেল মঙ্গলবার। মার্কিন অবরোধের কারণে ভেনেজুয়েলায় আটকে থাকা ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিশোধন ও বিক্রির একটি পরিকল্পনা প্রকাশ্যে এনেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরু থেকেই ট্রাম্প বলে আসছিলেন, দেশটির তেল এখন তাঁর।
ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, গত শনিবার ভোরের সেই ঝটিকা অভিযানে প্রায় ৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করছে। বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো নিউইয়র্কের একটি কারাগারে মাদক সংক্রান্ত মামলার বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার তেল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ট্রাম্প বর্তমানে ডেলসি রদ্রিগেজ ও মাদুরো সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথেই কাজ করছেন বলে মনে হচ্ছে। এটি ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর জন্য হতাশাজনক, যারা বড় কোনো ভূমিকার আশা করেছিল।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হবে। জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট অবিলম্বে এই পরিকল্পনা কার্যকর করবেন। ট্রাম্প বলেন, এই তেল বাজারমূল্যে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আমি নিশ্চিত করব যেন এই অর্থ ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এই চুক্তির অর্থমূল্য হতে পারে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়াও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে। এর ফলে এক্সন মবিল ও কনোকোফিলিপসের মতো তেল কোম্পানিগুলো উপকৃত হবে, যারা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আমলে জাতীয়করণের শিকার হয়েছিল।
বন্দি মাদুরো এবং রক্তক্ষয়ী অভিযানের বিবরণ
সোমবার ম্যানহাটনের একটি আদালতে মাদুরোকে কমলা ও বাদামি রঙের কয়েদির পোশাকে এবং পায়ে শিকল পরা অবস্থায় হাজির করা হয়। সেখানে তিনি নিজেকে ‘নির্দোষ’ এবং এখনো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করেন।
এদিকে ১৯৮৯ সালে পানামায় অভিযানের পর লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এটিই সবচেয়ে নাটকীয় সামরিক অভিযান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা জানায়নি, তবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী তাদের ২৩ জন সদস্যের মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করেছে।
কিউবা জানিয়েছে, অভিযানে তাদের ৩২ জন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নিহত সেনাসদস্যদের স্মরণে এক সপ্তাহের শোক ঘোষণা করেছেন। রাশিয়া, চীন এবং ভেনেজুয়েলার বামপন্থী মিত্ররা এই অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
রদ্রিগেজ ও কাবেলোর ওপর ট্রাম্পের ভরসা
সূত্র অনুযায়ী, সিআইএ ট্রাম্পকে জানিয়েছে দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর চেয়ে রদ্রিগেজ এবং মাদুরো সরকারের বর্তমান কর্মকর্তারাই বেশি কার্যকর হবেন। এ কারণেই ট্রাম্প মাচাদোকে বাদ দিয়ে রদ্রিগেজকেই সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একই সাথে ট্রাম্প প্রশাসন কট্টরপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলোকেও সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, মার্কিন দাবি পূরণ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি যদি রদ্রিগেজকে সহায়তা না করেন, তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। বর্তমানে কাবেলো নিরাপত্তা বাহিনীকে সাথে নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাস্তায় টহল দিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক চাপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিচ্ছে যেন তারা চীন, রাশিয়া, কিউবা এবং ইরানের সরকারি উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই দাবিগুলোর কথা তুলে ধরেছেন।
মাদুরো বন্দি হওয়ার পর থেকে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ তার সাথে ‘সহযোগিতা’ করেছে এমন যে কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে। সোমবার কারাকাসে সংবাদ সংগ্রহের সময় ১৪ জন গণমাধ্যমকর্মীকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল। তবে দেশটির উপ-যোগাযোগ মন্ত্রী সাইমন আরেচিডার দাবি করেছেন, পুরো দেশ বর্তমানে সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড দখলের উপায় নিয়ে ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ
মার্কিন হুমকি মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত লাতিন আমেরিকা