দীর্ঘদিন রাজনীতির নেপথ্যে থাকলেও বর্তমানে ঢাকার অলিগলি থেকে রাজপথ—সবখানেই বিলবোর্ড ও পোস্টারে দেখা যাচ্ছে শফিকুর রহমানের দাড়িওয়ালা মুখ। আগামীকাল বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) সাধারণ নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইসলামপন্থি সরকার গঠনের ডাক দিচ্ছেন তিনি।
৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির এক সময় কেবল ইসলামপন্থি মহলেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু কয়েক দশকের আড়াল ভেঙে তিনি এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনে জামায়াত জোট তাদের সাবেক মিত্র এবং বর্তমানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবে।
২০২৪ সালে জেনারেশন জেড (জেন জি) বা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে বাংলাদেশ। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে প্রায় ৯১ শতাংশই মুসলিম, যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও ইসলাম এখানে রাষ্ট্রধর্ম এবং জনসংখ্যার সিংহভাগ সুন্নি।

জনমত জরিপ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় এক সময় নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে যাচ্ছে। জামায়াতের এই উত্থান মডারেট ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। দলটির শীর্ষ নেতাদের ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ড দেওয়া হয়, অনেককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করে আন্ডারগ্রাউন্ডে ঠেলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে সহায়তার অভিযোগে শফিকুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি ১৫ মাস কারাগারে ছিলেন।
তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দেয়। ওই বছরের আগস্টে হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতের ওপর থেকে কড়াকড়ি শিথিল করে। পরে ২০২৫ সালে আদালতের রায়ে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপরই দ্রুত সক্রিয় হয় জামায়াত; দাতব্য কাজ এবং বন্যা মোকাবিলায় ঝাপিয়ে পড়ে তারা। সাদা দাড়ি ও শুভ্র পোশাকের শফিকুর রহমান হয়ে ওঠেন দলটির দৃশ্যমান মুখ।

ডিসেম্বরে রয়টার্সকে তিনি বলেন, আমরা (শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে) বারবার কথা বলতে চেয়েছি, কিন্তু বারবার আমাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর আমরা আবার সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।
চিকিৎসক পরিবার ১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজার জেলায় জন্ম নেওয়া শফিকুর রহমান ছাত্রজীবনে একটি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন। পরে তিনি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ২০২০ সালে তিনি দলটির আমিরের দায়িত্ব পান।
তার স্ত্রী আমিনা বেগম ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনিও একজন চিকিৎসক। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলেও চিকিৎসক। সিলেটে তাদের একটি পারিবারিক হাসপাতাল রয়েছে।

ঢাকার অনেকেই বলছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে শফিকুর রহমানের পুরো নামই তারা জানতেন না। এদিক থেকে তার সঙ্গে এবারের নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পার্থক্য বিশাল। তারেক রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে। দুই রহমানের (তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান) মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই।
জামায়াত বলছে, শফিকুর রহমান একজন বিনয়ী ও সৎ মানুষ। তিনি সহজ জীবনযাপন করেন এবং সাধারণ মানুষ তার কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে।
শূন্যতা কাজে লাগানো বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মো. মোস্তফা বলেন, অভ্যুত্থানের পরবর্তী এক মাস বাংলাদেশে কোনো দৃশ্যমান নেতা ছিল না। তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন। সেই সময় শফিকুর রহমান দেশজুড়ে সফর করেন এবং মিডিয়ার নজরে আসেন। মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি ফ্রন্টরানার হয়ে ওঠেন।

নির্বাচনী প্রচারে শফিকুর রহমান জামায়াতকে একটি দুর্নীতিমুক্ত এবং ইসলামি মূল্যবোধের ‘ক্লিন’ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। ডিসেম্বরে দলটি জেনারেশন জেড-এর দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র সঙ্গে জোট করে তরুণ ও কম রক্ষণশীল ভোটারদের নজর কাড়ে। দেশজুড়ে পপ-কালচার বা ‘গেম অব থ্রোন্স’ অনুপ্রাণিত পোস্টারে তাকে ‘দাদু আসছেন’ স্লোগানে তুলে ধরা হচ্ছে।
তাকে জামায়াতের কিছুটা নমনীয় মুখ হিসেবে দেখা হলেও নারীদের বিষয়ে তার বক্তব্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জামায়াত এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তিনি বলেছিলেন, পারিবারিক দায়িত্ব পালনের স্বার্থে নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করা উচিত নয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি পোস্টে বলা হয়, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করা ‘পতিতাবৃত্তির নামান্তর’। যদিও বিক্ষোভের মুখে জামায়াত দাবি করে তার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল।

শফিকুর রহমান অবশ্য নিজেকে নমনীয় ও যুক্তিপূর্ণ দাবি করে বলেন, আমাদের মূলনীতি ইসলামি ও কোরআনের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। আর কোরআন শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, এটি সমগ্র সৃষ্টির জন্য।
নির্বাসন থেকে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে তারেক রহমান: রয়টার্স