পারস্য উপসাগরের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত ক্ষুদ্র কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন ও আল জাজিরা জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন দ্বীপটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে ইরান সেখানে ব্যাপক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মরণফাঁদ তৈরি করে রেখেছে।
খারাগ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য একটি ‘লাইফলাইন’। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা, এই দ্বীপটি দখল করতে পারলে ইরানকে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করা যাবে। তবে, এই স্থল অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

ইরানের ‘মরণফাঁদ’ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্ভাব্য মার্কিন উভচর ল্যান্ডিং ঠেকাতে ইরান দ্বীপের উপকূলে অ্যান্টি-পার্সোনেল ও অ্যান্টি-আরমার মাইন পুঁতে রেখেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইরান সেখানে কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী মিসাইল এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। যদিও গত ১৩ মার্চ মার্কিন হামলায় দ্বীপটির কিছু রাডার ও মিসাইল স্টোরেজ ধ্বংস হয়েছে, তবুও মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় দ্বীপটি দখল করা মার্কিন সেনাদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
মার্কিন সেনা মোতায়েন ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক: বর্তমানে আমেরিকার দু’টি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে। এছাড়া ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় এক থেকে দুই হাজার সেনা এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পের মিত্রদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, শুধু এই দ্বীপ দখল করলেই কি হরমুজ প্রণালীর সংকট মিটবে? সাবেক ন্যাটো কমান্ডার অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানিরা অত্যন্ত চতুর ও নির্মম। তারা মার্কিন সেনাদের সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। বিকল্প হিসেবে তিনি দ্বীপটি দখল না করে সাগরে ‘অফশোর ব্লকেড’ বা অবরোধ তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন।

আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগ ও ইরানের হুমকি: ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কোনো আঞ্চলিক দেশ যদি এই দ্বীপ দখলে আমেরিকাকে সহায়তা করে, তবে সেই দেশের ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো’ ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হুঁশিয়ারি মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নতুন ফ্রন্ট খোলার হুমকি দিয়েছে।
শান্তি আলোচনা বনাম যুদ্ধের হুমকি: হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন, ইরানকে পরাজয় মেনে নিতে হবে। তারা যদি বাস্তবতা না বোঝে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন আঘাত করবেন যা তারা আগে কখনো দেখেনি। একদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন ইরানের সাথে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে, অন্যদিকে পেন্টাগন হাজার হাজার সেনা পাঠাচ্ছে। ইরান অবশ্য সরাসরি আলোচনার দাবি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

খার্গ দ্বীপ এখন দুই শক্তির দাবার গুটিতে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা যদি সেখানে স্থল অভিযানে নামে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা কেবল এই দ্বীপ নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
