ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহাপ্রলয় ঘটে গেল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূলী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে নবান্নের চাবিকাঠি এখন পদ্ম শিবিরের হাতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গ থেকে শুরু করে পাহাড়-তরাইয়ের উত্তরবঙ্গ, সর্বত্রই এখন গেরুয়া আবির।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যেন কোনো থ্রিলার সিনেমার ক্লাইম্যাক্সকেও হার মানিয়েছে। যে দক্ষিণবঙ্গ বা প্রেসিডেন্সি ডিভিশন ছিল তৃণমূলের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সেখানেই এবার ফাটল ধরিয়েছে বিজেপি। এমনকি খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেও শুভেন্দু অধিকারীর সাথে লড়াই করতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ঝরিয়েছেন।

কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা নিয়ে গঠিত প্রেসিডেন্সি ডিভিশন ছিল তৃণমূলের শক্তির উৎস। কিন্তু এবার সেই ‘পাওয়ার সেন্টার’-এ বিজেপি ২৭টি আসনে জয়ের পথে। কলকাতার ১১টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই এগিয়ে বিজেপি। মানিকতলা, জোড়াসাঁকো কিংবা শ্যামপুকুরের মতো এলাকায় ধরাশায়ী হয়েছেন শশী পাঁজা বা ব্রাত্য বসুর মতো হেভিওয়েট মন্ত্রীরা। মানুষের ক্ষোভ, হিন্দু ভোটের মেরুকরণ আর তৃণমূলের ‘গুন্ডাগিরি’র বিরুদ্ধে জনরোষ, এই তিন ফলায় কুপোকাত হয়েছে জোড়াফুল শিবির।
উত্তরবঙ্গের ৫৪ আসনের মধ্যে ২৭টিতে লিড নিয়ে আধিপত্য বজায় রেখেছে বিজেপি। দার্জিলিংয়ের গোর্খা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি আর চা বলয়ের শ্রমিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে অমিত শাহর রণকৌশল শতভাগ সফল। খারাপ আবহাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার নামতে না পারলেও ভার্চুয়ালি মানুষের মন জয় করেন শাহ। অন্যদিকে রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কেও থাবা বসিয়েছে বিজেপি, যার ফল মিলেছে কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে।

এক সময়ের মাওবাদী অধ্যুষিত জঙ্গলমহলে এবার তৃণমূলের ভরাডুবি হয়েছে। ঝাড়গ্রামের ৪টি এবং পুরুলিয়ার ৯টি আসনের সবকটিতেই এগিয়ে বিজেপি। বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরেও তৃণমূলের তথৈবচ অবস্থা। আদিবাসী নেত্রী তথা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে ‘অসম্মান’ করার যে অভিযোগ নরেন্দ্র মোদী প্রচারের হাতিয়ার করেছিলেন, তা সরাসরি জঙ্গলমহলের মানুষের হৃদয়ে গিয়ে লেগেছে। কুর্মি সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতি আর আলু চাষীদের অসন্তোষ, সব মিলিয়ে জঙ্গলমহল এখন পুরোপুরি পদ্মময়।
২০২১ সালে যে বিজেপি দক্ষিণবঙ্গে মাত্র ১৪টি আসন পেয়েছিল, এবার তাদের এই উলম্ফন বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করল। মাছে-ভাতে থাকা বাঙালি কি তবে এবার পরিবর্তনের স্বাদ বদলে গেরুয়া ঝোলেই বেশি তৃপ্তি পেল? নির্বাচনের এই ট্রেন্ড অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। নবান্নে মমতার ছবি সরে গিয়ে কার ছবি বসবে, তা নিয়ে এখন সরগরম দিল্লির অলিন্দ থেকে কলকাতার পাড়ার মোড়। তবে এটুকু নিশ্চিত, বাংলার রাজনীতিতে ‘দিদি’র একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন আপাতত অতীত।
