ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে চীনা কোম্পানি হানডার বিনিয়োগ বিষয়ে গত ১ এপ্রিল একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করে একাত্তর টেলিভিশন। তাতে উঠে আসে, বিনিয়োগ পেতে হানডাকে বিশেষ ও বৈষম্যমূলক সুবিধা দিচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজা। এমনকি অনেক কর্মকর্তার আপত্তি সত্ত্বেও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর বিশেষ ইচ্ছায় উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে এ প্রতিবেদন ‘বিভ্রান্তিকর’ দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছে বেজা। এদিকে প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্য-প্রমাণ বলছে, রিপোর্টে কোনো অসত্য তথ্য নেই। বরং বেজা তথ্য গোপনের চেষ্টা করছে।
বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
হানডার পেছনে বেজার বিনিয়োগ প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, হানডার এই বিনিয়োগ পেতে বেজার খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা। বেজা দাবি করেছে, এই তথ্য সঠিক নয়। সংস্থাটির হিসাবে, জমি অধিগ্রহণ বাবদ ২১৯ কোটি ও সেবা সংযোগ বাবদ ৩০ কোটি নিয়ে মোট আড়াইশ কোটি টাকা খরচ হবে। যা অন্য প্রকল্পের তুলনায় কম।
প্রতিবেদকের হিসাবে, এই প্রকল্পে বেজার সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকাই খরচ হচ্ছে। প্রতিবাদলিপিতে সংস্থাটি শুধু ৩৭ একর জমির অধিগ্রহণ বাবদ মূল্য ২১৯ কোটি টাকা দেখিয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পে আরও ৪০ একর জমি ব্যবহার হচ্ছে, যা আগে থেকেই বেজার হাতে ছিল। সুতরাং পুরো জমির বর্তমান মূল্য প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা। এছাড়া জমিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগে খরচ হবে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এছাড়া চুক্তি অনুযায়ী হানডা পানির জন্য বেজাকে কোনো সার্ভিস চার্জ দেবে না। অর্থাৎ লিজের ৫০ বছরে ফ্রি পানি পাবে কোম্পানিটি। কিন্তু বেজা পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিলে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা খরচ করে ৫০ বছরে শত কোটি টাকা সার্ভিস চার্জ পেতো। অর্থাৎ কোম্পানিটির জন্য ছাড় ও খরচের মোট পরিমাণ সাড়ে পাঁচশ কোটির কম নয়। প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন, আর কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোনো কোম্পানি পানির এ সুবিধা পাচ্ছে না।
বিনিয়োগ থেকে বেজার আয়:
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, হানডাকে জমি দেওয়ার বিনিময়ে বছরে প্রতি বর্গমিটারে তিন ডলার ভাড়া পাবে বেজা। অর্থাৎ বছরে সংস্থাটির আয় হবে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এই তথ্য বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে বেজা। সংস্থাটির হিসাবে, তিন ডলার রেটে বছরে আয় হবে ৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
তবে বেজার এ বক্তব্য সঠিক নয়। কারণ, হানডাকে দেওয়া জমির ভাড়া বছরে প্রতি বর্গমিটার ৩ ডলার। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ভাড়ার মধ্যে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তিন ডলার পেলেও বেজার সেখান থেকে ভ্যাট দিতে হবে। ভ্যাট পরিশোধের পর বেজার আয় দাঁড়াবে বছরে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
প্রতিবেদক এটিও নিশ্চিত হয়েছে যে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের আর কোনো বিনিয়োগকারী জমির ভাড়ার মধ্যে ভ্যাট সুবিধা পান না।
নাহিয়ান রোচির চীন ভ্রমণ:
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বেজার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর নিয়োগ করা পরামর্শক নাহিয়ান রহমান রোচি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডার সদস্য হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আগে পরামর্শক থাকা অবস্থায় হানডার আমন্ত্রণে চীন সফর করেন। প্রতিবাদলিপিতে বেজা বলেছে, একে ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
কিন্তু প্রতিবেদক নাহিয়ান রহমান রোচির কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক কর্মকর্তার অসন্তোষের বিষয়ে জেনেছেন। রচি মূলত বিডার কর্মকর্তা। অন্যদিকে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেজা। এই দুই সংস্থা এক নয়, বরং আলাদা। তাছাড়া চীন সফরের সময় তিনি শুধু পরামর্শক ছিলেন। ফলে এ প্রকল্পে নাহিয়ান রোচির অতি আগ্রহ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।
কর্মকর্তাদের অসন্তোষ:
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, হানডার এ প্রকল্প নিয়ে বেজা কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদলিপিতে বেজা দাবি করেছে, প্রকল্পটি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। কিন্তু প্রতিবেদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েই প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
কর্মকর্তারা জানান, হানডাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা প্রকাশ হলে অন্য বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলবে। তাছাড়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচের বিপরীতে সামান্য আয়ে বেজা তহবিল সংকটে পড়বে। এছাড়া হানডাকে বিদ্যমান কোনো অঞ্চলে জমি দেওয়া যেত। অথবা অনেকগুলো কোম্পানি আসতে পারে, এমন কোনো জোন তৈরি করা যেত বলেও জানান তারা।
