গত বছরের তুলনায় শ্রমিক খরচ, কীটনাশক, পরিবহনসহ অন্য খরচ বাড়লেও নওগাঁয় এ বছর আম কম দামে কেনা-বেচা হচ্ছে। আম চাষীদের অভিযোগ, আড়ৎদার ও কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আমের দাম বেঁধে দিয়েছে। ফলে আমের ভরা মৌসুমে আমের নায্য মূল্য পাচ্ছেন না চাষীরা।
তাদের দাবি, আমের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিদেশে আরও বেশি করে রপ্তানি, নিরাপদ আম উৎপাদন, প্যাকেজিং ব্যবস্থাসহ দ্রুত হিমাগার নির্মাণ করতে হবে।
নওগাঁয় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের আম্রপালি, বারি-ফোর, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাংগো, ফজলি, ল্যাংড়াসহ স্থানীয় জাতের আম চাষ করা হয়েছে। মুকুল আসার সময় তীব্র খরা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত বাম্পার ফলন হয়েছে।

জেলার সাপাহার উপজেলার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে হাটে মানভেদে প্রতি মণ ল্যাংড়া আম এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা, ক্ষিরশাপাতি বা হিমসাগর আম এক হাজার ৮০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা, নাক ফজলি আম এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা এবং আম্রপালি দুই হাজার টাকা থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।
দিনশেষে এসব আম চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
নিয়ামতপুর উপজেলা থেকে আম বিক্রি করতে আসা ইন্দ্রিস আলী বলেন, কিছুদিন আগেও আম বিক্রি করেছি। দেখা যায় দরদাম ঠিক হওয়ার পর আড়তে আম নিয়ে গেলে বলা হয় আম আকারে ছোট। ৫১-৫২ কেজিতে মণ দিতে হবে। তখন বাধ্য হয়ে বেশি দিয়ে বিক্রি করতে হয়।

তিনি বলেন, এমনিতেই গত বছরের চেয়ে এ বছর আমের দাম কম। কীটনাশকের দাম বেশি। ৫২ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। সব দিক দিয়েই আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারের নজর থাকলে আমরা এই ক্ষতিগ্রস্তর মধ্যে পড়তাম না।
পোরশা থেকে আম বিক্রি করতে আসা শহিদুল ইসলাম বলেন, আম্রপালি ১৬ ক্যারেট আম নিয়ে আসছি। দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা মণ দাম বলছে, কিন্তু এখনও বিক্রি করি নাই।
তিনি বলেন, আগে ৪৫ কেজিতে মণ নেওয়া হতো। এখন আস্তে আস্তে ক্যারেটসহ ৫১-৫২ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। এতে করে খুব সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের।
পত্নীতলা থেকে আম বিক্রি করতে আসা ইউনুস আলী বলেন, দুই বিঘা জমিতে আমের বাগান করেছি। এখানে আম বিক্রি করতে এসে প্রতি মণে ৫১-৫২ কেজিতে দিতে হয়। ৪৮ কেজি হিসেবে এক মণ ওজন নেওয়ার কথা, কিন্তু বেশি না দিলে আম নিতে চায় না। দরদাম ঠিক হওয়ার পর আম আড়তে নেওয়ার পর বেছে বেছে নিতে চায়। তখন বাধ্য হয়ে বেশি দিয়ে আম বিক্রি করতে হয়।

সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতি সভাপতি কার্তিক সাহা চাষীদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দুই ক্যারেটের ওজন চার কেজি। ভালো আম হলে দুটি ক্যারেটসহ ৪৮ কেজিতে মণ নেয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, কৃষক ভালো ও বড় আকারের আমের মধ্যে ছোট জাতের আম নিয়ে এসে। বাজারে দাম নির্ধারণ করা হলেও আড়তের মধ্যে এসে ছোট আম না নিতে চাইলে তখন ছোট আম বাছতে দেন না। তখন ৫০/৫২ কেজিতেই মণ আম দিয়ে যান।
তিনি আরও বলেন, কানসাট ও রহনপুরে ক্যারেট ছাড়ায় ৫২ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। আর আমাদের এখানে ক্যারেটসহ ৪৮ কেজিতে আম কেনা হয়। এর প্রভাবে সাপাহারে ব্যবসায়ীরা কম আসছে। ওজন সব জায়গায় সমান হলে আমের দাম আরও বেশি হয়ে থাকতো।
অপরদিকে আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল হক জানান, দুই একটি কর্পোরেট গ্রুপের প্রতিনিধিদের বেঁধে দেয়া দামের কারণেই বাজারে কম দামে আম কিনতে বাধ্য হন। তারা দাম বেঁধে না দিলে আম চাষীরা ভালো দাম পেতেন।

সাপাহারের বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা জানান, আমের নায্যমূল্য নিশ্চিতে বিদেশে আরও বেশি করে আম রপ্তানিযোগ্য করতে আম চাষিদের প্রশিক্ষণ, শুল্ক কমানো, প্যাকেজিং করাসহ হিমাগার নির্মাণ করতে হবে।
তিনি জানান, হিমাগারে আম এক মাস পর্যন্ত রাখা যায়। আম কাঁচামাল হওয়ায় খোলা পরিবেশে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে ভরা মৌসুমে আম কম দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, গত কয়েক বছর থেকে আম উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে নওগাঁ জেলা। এ বছরও তিন লাখ ৭৮ মেট্রিকটন উৎপাদনের আশা রাখা হয়েছে। গত বছর নওগাঁ থেকে ৭৭ মেট্রিকটন আম বিদেশে রপ্তানি হলেও এ বছর ৪০০ মেট্রিকটন আম রপ্তানি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নওগাঁয় আম উৎপাদনের ধারা অব্যাহত হলে আগামীতে হিমাগার স্থাপনের সম্ভব রয়েছে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।
একাত্তর/এসি
