এতো মায়ায় জড়ানো সুরেলা কণ্ঠের শিল্পী যেন বিরল। বিশেষ করে তার গাওয়া দেশাত্ববোধক গান। ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল,’ যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়- কালজয়ী এসব গানের শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ।
পাকিস্তান রেডিও ও টিভিতে অল্প বয়সেই গায়িকা হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা করেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তখন তিনি শাহনাজ বেগম নামে পরিচিতি পান। দীর্ঘ ৫ দশকেরও অধিক সময়ের ক্যারিয়ারে তার কণ্ঠে রয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
১৯৫২ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। তার পিতার নাম এম ফজলুল হক ও মাতার নাম আসিয়া হক। শাহনাজের ভাই আনোয়ার পারভেজ দেশবরেণ্য সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক এবং আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা ও গায়ক।

বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র গাওয়া ৪টি গান স্থান পায়। গানগুলো হলো- খান আতাউর রহমানের কথা ও সুরে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথা ও আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ আর ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’।
বাবার অনুপ্রেরণা আর মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একেবারে ছোটবেলায় শাহনাজের গানে হাতেখড়ি। বরেণ্য এ শিল্পী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নেন ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে। এরপর তিনি ওস্তাদ মনির হোসেন, শহীদ আলতাফ মাহমুদের কাছেও গানে তালিম নেন। তিনি গজল শিখেছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি গজলসম্রাট মেহেদী হাসানের কাছে।শাহনাজ রহমতুল্লাহ মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। এরপর বহু চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ১৯৬৪ সাল থেকে টেলিভিশনে গাইতে শুরু করেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তিনি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আলাউদ্দিন আলী, খান আতা প্রমুখের সুরে গান গেয়েছেন।
পাকিস্তানে থাকার সুবাদে করাচি টিভিসহ উর্দু সিনেমাতেও গান করেছেন। সত্তরের দশকে অনেক উর্দু গীত ও গজল গেয়ে সঙ্গীতপিপাসুদের মাতিয়েছেন এই শিল্পী। সেসব গানে এখনও মানুষ বুঁদ হয়ে থাকেন।

সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার ১৯৯২ সালে শাহনাজ রহমতুল্লাহকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯০ সালে ছুটির ফাঁদে চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কিংবদন্তি এই সঙ্গীতশিল্পী।
শাহনাজ রহমতুল্লাহ ১৯৭৩ সালে সেনা কর্মকর্তা আবুল বাশার রহমতুল্লাহর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির এক কন্যা নাহিদ রহমতুল্লাহ ও এক পুত্র এ কে এম সায়েফ রহমতুল্লাহ।
২০১৯ সালে ২৩ মার্চ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্তে পাড়ি দেন দেশবরেণ্য কন্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ।
