শনিবার মধ্যরাতে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে হেরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর গদি হারিয়েছেন ইমরান খান। তবে এর আগ থেকেই টালমাটাল ছিলো দেশটির রাজনীতি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হবার হবার নিজ দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ঘিরে গড়ে ওঠা জোট নিয়ে সরকার গঠন করেন ইমরান খান।
সরকার গঠনের পর থেকেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে ব্যাপক কর্মকাণ্ড শুরু করেন ইমরান। কিছুদিন আগে ঘোষণা করেন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি।
তবে সরকার গঠনের পর থেকেই বিরোধীরা ইমরানকে হটাতে তৎপর ছিলো। তার অংশ হিসাবে সম্প্রতি বিরোধী দলগুলো ইমরানের জোটে ভাঙ্গন ধরাতে শুরু করে।
আর এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিবিদ। তারাই ইমরান খানকে হটানোর পেছনে ক্রীড়নক হিসাবে কাজ করেছেন। এরা হলেন—

শাহবাজ শরিফ
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ভাই শাহবাজ শরিফ একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। নওয়াজ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষিত হবার পর শাহবাজ দৃশ্যপটে আসেন।
বলা হয়, নওয়াজের দলকে তিনিই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শুরু থেকেই ইমরানের কট্টর সমালোচক হিসাবে তার পরিচিতি গড়ে উঠে।
রাজনীতির পালাবদলে শাহবাজ শরিফই এখন প্রধানমন্ত্রী পদে ইমরানের স্থলাভিষিক্ত হবার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। বিরোধী অন্য সব নেতাদের সমর্থন আছে তার পেছনে।
৭০ বছরের শাহবাজ নিজের ক্ষমতাতেই পাকিস্তানের এজন্য শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করা শাহবাজ পাকিস্তান মুসলিম লীগ-এন এর সভাপতিও।
জ্বালাময়ী ভাষণের জন্য শাহবাজের আলাদা খ্যাতি রয়েছে। বিশেষ করে ভাষণে বিপ্লবী কবিতা উদ্ধৃত করার জন্য তিনি সুপরিচিত। এছাড়া একজন কঠোর প্রশাসক হিসাবেও সুনাম আছে।
তবে কাজ পাগল এই রাজনীতিবিদ বহুবিবাহ এবং লন্ডন ও দুবাইতে বিলাসবহুল বাড়ি নিয়ে শিরোনাম হলেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে বেশ জনপ্রিয় শাহবাজ খান।

আসিফ আলী জারদারি
একটি ধনী সিন্ধু পরিবার থেকে আসা আসিফ আলী জারদারি তার প্লেবয় জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের শীর্ষ ব্যক্তিতে পরিণত হন বেনজির ভুট্টোকে বিয়ে করে।
বেনজির প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হবার কিছুদিন আগে তাকে বিয়ে করেন আসিফ আলী জারদারি। বিয়ের পর তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেন।
বেনজির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সময় স্ত্রীর ক্ষমতাবলে জারদারি দেশটির বড় বড় প্রকল্পের চুক্তি ও ব্যবসায় নাক গলাতে শুরু করেন এবং ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ হিসাবে পরিচিতি পান।
দুর্নীতি, মাদক চোরাচালান এবং খুনের অভিযোগে জারদারি দুবার কারাগারে বন্দী হলেও তাকে কখনও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি অজানা কারণে।
২০০৭ সালে বেনজির ভুট্টোকে হত্যার পর ৬৭ বছরে জারদারি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) কো-চেয়ারম্যান হন। এক বছর পরে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে রাষ্ট্রপতি হন।

বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি
বেনজির ভুট্টো এবং আসিফ জারদারির ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে ধরা হয় পাকিস্তান রাজনীতির ভবিষ্যতের কাণ্ডারি।
একদিকে রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, অন্যদিকে মায়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে মাত্র ১৯ বছর বয়সে পিপিপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত জন বিলাওয়াল।
অক্সফোর্ড থেকে পড়াশুনা করা ৩৩ বছরের বিলাওয়ালকে একজন প্রগতিশীল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্রায়ই নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলে থাকেন তিনি।
পাকিস্তানের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি ২২ বছরের নিচে। এ কারণে বিলাওয়াল তরুণদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। সামাজিক মাধ্যমে দারুণ সক্রিয় তিনি। তবে উর্দুতে দক্ষতা কম তার।

মাওলানা ফজলুর রহমান
একজন কট্টর ইসলামপন্থী হিসাবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করার পর, মুসলিম ধর্মগুরু মাওলানা ফজলুর রহমান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেকে নমনীয় হিসাবে পরিচিত করে তোলেন।
কট্টর পথ ছেড়ে সহনশীল হিসাবে নিজের পরিচিত করার জন্য ফজলুর রহমান পাকিস্তানের ডান ও বাম উভয়পন্থী দলগুলোর সঙ্গে মিত্রতা গতে তোলেন। স্থির করেন ইমরানকে হটানোর।
ক্ষমতা দখলে তার জামিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলাম (এফ) পার্টি কখনই পর্যাপ্ত সমর্থন জোগাড় করতে না পারলেও, সরকারবিরোধী জোটে তিনি অন্যতম মূল খেলোয়াড়।
আরও পড়ুন: ইমরান খান পতনের পেছনের কারণ
হাজার হাজার মাদ্রাসা ছাত্রদের একত্রিত করার ক্ষমতা থাকায় মাওলানা ফজলুর রহমান সেটিতে তার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে ইমরানকে বেশ কয়েকবার বিপদে ফেলেছেন।
ইমরান খানেরে সঙ্গে তার শত্রুতা অনেক গভীর। ব্রিটিশ নাগরিক জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করার কারণে ইমরানকে ‘ইহুদি’ হিসাবে আখ্যায়িত করতেন ফজলুর রহমান।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে ডিজেলের লাইসেন্স সংক্রান্ত এক কেলেঙ্কারিতে ফজলুর রহমানের নাম আসর পর তাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলে সম্বোধন করতেন ইমরান খান।
