ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস এলাকা দখল করতে রাশিয়ার সেনাবাহিনী হামলা শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানাচ্ছে, ডনবাস অঞ্চলের দীর্ঘ ৪৮০ কিলোমিটার জুড়ে থাকা ফ্রন্টলাইনে ইউক্রেনীয় সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া।
ক্রেমলিন দাবি করেছে, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত ডনবাস এলাকার কমপক্ষে এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের সেনারা সফল হামলা চালিয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার রাতের মধ্যে মিসাইল ও আর্টিলারি বাহিনী কমপক্ষে ১,২৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

রুশ কর্মকর্তারা দারি করেছেন, আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা নিখুঁত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সব মিসাইল সফলভাবে ১৩টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
রাশিয়া আরও দাবি করেছে, কমপক্ষে ৬০টি ইউক্রেনীয় সেনাঘাটিকে উড়িয়ে দিয়েছে তাদের সেনাবাহিনী। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্লোভইয়ানস্ক শহরের একটি ঘাটি রয়েছে।
ডনবাস ছাড়াও রাশিয়া ইউক্রেনের আরও কিছু শহরে হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে আছে পশ্চিমের লিভিভ। যে শহর থেকে প্রথমবার বেসামরিক মানুষ নিহতের খবর এসেছে।
ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার বিভিন্ন শহরে রুশ হামলায় নিহত হয়েছে অন্তত ১৭ জন। আহত হয়েছে আরও অনেকে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।

এদিকে, জাতিসংঘ জানিয়েছে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৭২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধের মূল রণক্ষেত্রে এখন পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস অঞ্চল। সোমবার দোনেৎস্কর ফ্রন্টলাইন বরাবর শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও ভিডিও বার্তায় বলেন, ডনবাসের যুদ্ধ শুরু করেছে রাশিয়া। এ সময় তিনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
তিনি বলেন, রুশ সেনাবাহিনীর বেশ বড় একটি অংশ ডনবাসে আক্রমণ শুরু করেছে। রাশিয়া সেখানে যত সেনাই পাঠাক আমরা লড়াই করবো। আমাদের সেনারা খুব শক্তিশালী।
জেলেনস্কি প্রশাসনের প্রধান কর্মকর্তা আন্দ্রি ইয়েরমাক রাশিয়ার ডনবাস আক্রমণকে ‘যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

ডানবাস- পূর্ব ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ এক এলাকা। নেখানের বেশিরভাগ বাসিন্দাই রুশ-ভাষী। এই এলাকায় গত আট বছর ধরে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে একদল বিচ্ছিন্নতাবাদী।
ইউক্রেন দাবি করে আসছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দিয়ে আসছে ক্রেমলিন। রাশিয়াও এই এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চায়।
রুশ সেনা বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই কিয়েভ দখলের চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু কোন ভাবেই সাফল্য পাচ্ছে না। এ অবস্থায় রুশ সেনা নজর ঘুরিয়ে পুরোপুরি চলে গেছে ডানবাসের দিকে।
তবে জেলেনস্কি জানিয়েছে রুশ সেনা ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যতই দাপট দেখাক না কেন ইউক্রেনীয় বাহিনী স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না। তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান বলেছেন রুশ বাহিনী সোমবার থেকেই লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক অঞ্চলে আক্রমণ তীব্র করেছে। এই দুটি এলাকাই ডনবাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে ছিনিয়ে নেয়া ক্রিমিয়াতেও সেনা পাঠাচ্ছে ক্রেমলিন। অন্যদিকে কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছে খারকিভ, বাখমুতের মত যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলো।
এদিকে সোমবার পশ্চিমাঞ্চলীয় লিভিভ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত সাত জন নিহত হয়েছে। রাশিয়ার হামলায় লুহানস্ক ও দোনেৎস্কে মারা গেছে আটজন।
এছাড়া খারকিভ শহরে আবাসিক ভবনের ওপর রুশ গোলাবর্ষণে অন্তত দু’জন বেসামরিক নিহত হয়েছে। রাজধানী কিয়েভে এবং মাইকোলাইভেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইউক্রেন প্রশাসন জানিয়েছে, রাশিয়ার হামলায় প্রায় বিধ্বস্ত মারিউপোল। একটি স্টিলের কারখানায় ইউক্রেনীয় বাহিনী রয়েছে। সেটাই রাশিয়ার কাছে শেষ বাধা।

এই কারখানা রয়েছে শহের দক্ষিণ প্রান্ত। তবে এখনও ওই স্টিল কারখানা থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাকে আটকানের চেষ্টা করছে। কারখানায় সাধারণ মানুষও আশ্রয় নিয়েছে।
এদিন বিভিন্ন শহরে রুশ হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহতের দাবি করেছে ইউক্রেন। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের ৩০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত বেসামরিক মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়ে ২০৭২ জনে দাঁড়িয়েছে।
আর আহত হয়েছে দুই হাজার ৮১৮ জন। তবে, মৃতের প্রকৃত সংখ্যা আরে বেশি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
