দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজধানী সিউলে হ্যালোইন উৎসবে পায়ের নিচে
চাপা পড়ে ১৫৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন। নিহত
ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছে তিন শতাধিক
মানুষ।
দক্ষিণ কোরিয়ায়, করোনার বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার তিন বছর পর জমকালো এই হ্যালোইন উৎসবের আয়োজন করা হয় রাজধানী সিউলের ইথেওন এলাকায়। উৎসবে সামিল হতে শনিবার রাতে ওই এলাকাযয় লাখেরও বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলো।
‘মৃত আত্মাদের স্মরণে’ প্রতি বছর অক্টোবরের শেষে হ্যালোইন উৎসব হয়। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর দেশটিতে হ্যালোইনের এ উৎসব বন্ধ ছিল। এরপর এবারই প্রথম এই উৎসব হয়, যেখানে মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা ছিলো না।

হ্যালোইন উদযাপনের মধ্যেই একটি সরু গলিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হলে পায়ের চাপায় পিষ্ট হয় অনেকে। মূহুর্তেই পুরো উৎসব পরিণত হয় শোক আর আতঙ্কে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার আগে সেখানে গোলমেলে পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তখন পুলিশ লোকজনকে আর সামলাতে পারেনি। দুর্ঘটনা পর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয় সেখানে। সে অনুযায়ী সার্বিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ছিল। পরিস্থিতি কোনভাবেই প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না। মানুষকে নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পুলিশ সেখানে ছিলো না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, উৎসবে এক লাখেরও বেশি লোক অংশ নিয়েছিল। সরু গলিপথ ও রাস্তায় লোকজন উপচে পড়ছিল। শ্বাসরুদ্ধকর ভিড় ঠেলে লোকজন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে একজন আরেকজনের ওপর স্তুপের মতো আছড়ে পড়ে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, সিউলের ইথেওন জেলায় একটি বাজারে শনিবার অনেক মানুষ কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন। আশপাশের পাব এবং বারগুলিতেও জড়ো হয়েছিলেন অনেকে। প্রায় লক্ষ লোকের ভিড় হয়েছিলো হ্যামিলটন হোটেলের সামনের রাস্তাটিতে। সেখানেই বিপত্তি।
যে রাস্তায় শতাধিক মানুষ মারা গিয়েছেন, সেই রাস্তাটি বেশ সঙ্কীর্ণ। মাত্র চার মিটার চওড়া সেই গলির সঙ্গে তুলনা হতে পারে পুরনো ঢাকার সরু অলিগলির কথা। সেই রাস্তার হ্যামিল্টন হোটেল থেকে বের হওয়া মানুষ আর সব স্টেশন থেকে আসার মানুষের চাপেই ঘটে ট্রাজেডি।
ভিড়ের চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে মানুষ। তাতেই ঘটে বিপত্তি। অনেকে রাস্তাতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, সরু এক ফালি রাস্তা মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করছে। তিলধারণেরও জায়গা ছিল না সেই গলিতে।

রাস্তার ধারে মৃতদেহের স্তূপ জমা হয়ে গিয়েছিল এক সময়। এ ছাড়া,ভিড়ের মাঝে কেউ অসুস্থদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করছিলেন,কেউ রাস্তায় শুয়ে থাকা ব্যক্তির কৃত্রিম শ্বাসকার্য চালানোর চেষ্টা করছিলেন, সবই ধরা পড়েছে ক্যামেরায়।
একটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ভিড় থেকে বাঁচতে কেউ কেউ রাস্তার ধারের দেওয়াল বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন। পথে সকলের মুখেই আতঙ্কের ছাপ ছিল স্পষ্ট।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমি একটি বারে বসেছিলাম। আমার বন্ধু ফোন করে জানায়, বাইরে সাংঘাতিক কিছু ঘটছে। আমি বাইরে বেরিয়ে দেখি রাস্তায় লোকজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তাঁদের কৃত্রিম ভাবে শ্বাস প্রক্রিয়া সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

আরেকজন বলেন, রাস্তায় সবার দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছিল না। মানুষ এক জন আর এক জনের উপর উঠে পড়েছিলেন। সমাধির মতো দেখাচ্ছিল তাঁদের অবস্থান। কেউ কেউ সংজ্ঞা হারাচ্ছিলেন। কাউকে দেখে মৃত বলেই মনে হচ্ছিলো।
নিহতের সংখ্যা প্রথমে ৫৯ জনের কথা জানানো হয়েছিল। পরে সময়ের সাথে সাথে তা বাড়তে থাকে। এরইমধ্যে মৃতের সংখ্যা দেড় শতাধিক ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন । তারা ইরান, উজবেকিস্তান, চীন ও নরওয়ের নাগরিক।
এখন পর্যন্ত ১৯ জন বিদেশিসহ ১৫৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। হ্যালোইন উৎসবের সময় হুড়োহুড়িতে অনেক লোক মাটিতে পড়ে যায়, আর এ কারণে বহু সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। যাদের বয়স ২০ বছরের কম।

আরও পড়ুন: গুজরাটে ঝুলন্ত সেতু ছিঁড়ে ৩০ জনের মৃত্যু, আহত বহু
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল এ ঘটনার পর জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। দুর্ঘটনাস্থল পরির্দশন করে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রোববার রাষ্ট্রীয় শোকও ঘোষণা করা হয়েছে। যা চলবে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত। হ্যালোইন ট্রাজেডির ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা।
দক্ষিণ কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, আমেরিকা দুঃখজনক এ সময়ে সিউলের পাশে আছে। তিনি বলেন, আমরা কোরীয় জনগণের সাথে শোক প্রকাশ করছি এবং যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্যের জন্যে শুভকামনা পাঠাচ্ছি।
একাত্তর/আরবিএস
