পৃথিবী উপরিতল গঠিত মাটি আর পানিতে। কোথাও হাজার মাইল শুধু পানি, কোথাও হাজার মাইল পানি। তবে সব জলভাগের নিচেই রয়েছে মাটি। ফলে গোটা পৃথিবীটা আসলে একটি সুবিশাল মাটির পিন্ড বা শিলাপিন্ড। যা কখনও নরম, কখনও শক্ত।
সুউচ্চ হিমালয়, আল্পস থেকে শুরু করে আন্দেজ। বা তিব্বত-পামিরের মতো মালভূমি। পৃথিবী পৃষ্ঠের অনেক জায়গাই কঠিন পাথরে গড়া। কিছু কিছু জায়গায় মাটিও এতোটাই কঠিন যে চাষাবাদ করা রীতিমতো দুষ্কর। উপরিভাগের যখন এমন তখন পৃথিবীর কেন্দ্র কেমন?

যেহেতু পৃথিবী একটি ত্রিমাত্রিক গোলক, তাই এরও ভরকেন্দ্র আছে। যাকে ইনার কোর বলা হয়। এই কোরের ব্যাস হচ্ছে ১২২০ কিলোমিটার। ধারণা করা হয় এটা পুরোটাই লোহা আর নিকেলের একটা সলিড বল। এটা আয়তনে আমাদের পৃথিবীর ২০ আর চাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ।
এই লোহার বলের তাপমাত্রা প্রায় ৫৪৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, যেটা কিনা সূর্যের উপরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় সমান। তবে এসব ধারণা মাত্র। পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড আর ভুমিকম্পের সাথে সম্পর্কিত ডাটা থেকে এমনটা ধারণা করে নেয়া হয়।
তবে বিজ্ঞান এগিয়ে যাবার কারণে এসব ধারণা এখন বড় ধরনের ধাক্কার সামনে দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি ভূবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষকরা দাবি করেছেন, পৃথিবী পৃষ্ঠের উপরিতলের মতো ভূগর্ভস্থ এলাকা মোটেই কঠিন পদার্থে তৈরি নয়।

বরং তরল ও কঠিনের সংমিশ্রণের একটি থকথকে মণ্ডের মতো পরিস্থিতি সেখানে। যা ভূগর্ভের এক জায়গা থেকে অন্যত্র প্রবাহিত হয়। ভূকম্পন তরঙ্গের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পেয়েছেন, পৃথিবীর ভরকেন্দ্র শক্ত নয়, পারদের মতো তরলে ভরপুর।
ভূবিজ্ঞানীদের দাবি, এই নীল গ্রহের একেবারে কেন্দ্র থেকে কম্পনের প্রতিধ্বনি ভূস্তরের উপরে ফিরে আসার প্রমাণ পেয়েছেন তাঁরা। আর তাতেই কেন্দ্রস্থলের ওই এলাকা সম্পর্কিত ধারণা অনেকটাই বদলেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
তারা বলছেন, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল প্রতি বছর ০.০৪ ইঞ্চি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন্দ্রের ভেতরের দিক তুলনামূলকভাবে বেশি কঠিন। বাইরের অংশ অনেকটাই তরল অবস্থায় রয়েছে। তাপমাত্রা হ্রাসের জেরে ওই তরল অংশও কঠিনে পরিণত হচ্ছে। এ কারণেই কলেবরে বাড়ছে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল।

উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কিথ কোপার বলেন, ভূকেন্দ্রে কোর এলাকায় থকথকে মণ্ডের মতো পদার্থের মধ্যে রয়েছে তরলীভূত লোহা। যেহেতু পৃথিবীর অভিকর্ষ বল রয়েছে, তাই চৌম্বকীয় টানে ওই তরল লোহা ঘূর্ণায়মান অবস্থা তৈরি করতে পারে। ভূগর্ভের অনেকটা গভীরে গেলে তরল লোহার স্তর মিলতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
চলতি বছরেই ভূগর্ভের কেন্দ্রস্থল ও তার বাইরের অংশের মাঝে সুবিশাল এক পর্বতের খোঁজ পাওয়া গেছে। যার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ অনায়াসেই এভারেস্টকে ছাড়িয়ে যাবে। আর উচ্চতার দিকে হিমালয়ের চেয়ে ওই পর্বত চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বলে দাবি করেছেন গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ভূমিকম্প ও পরীক্ষামূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণে তৈরি তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর কেন্দ্র মণ্ডলের সুবিশাল পর্বতমালার অস্তিত্বের কথা জানান। তরল ও কঠিনের সংমিশ্রণে তৈরি থকথকে পদার্থগুলো জমেই সে পাহাড় তৈরি হয়েছে।
একাত্তর/এআর
