কৃষক আন্দোলনে আবারও উত্তাল ভারত। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবিতে মঙ্গলবার থেকে ‘দিল্লি চলো’ শুরু করেন দেশটির কৃষকরা। রাতে পদযাত্রা বন্ধ রাখলেও বুধবার সকাল থেকে আবারও দিল্লির উদ্দেশে রওনা পদযাত্রা শুরু করেছে। তারা এখনো দিল্লি থেকে প্রায় দু’শো কিলোমিটার দূরে হরিয়ানা রাজ্যের শম্ভু সীমান্তে রয়েছেন। পদযাত্রা ঠেকাতে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে দেশটি।
এর আগে মঙ্গলবার পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে হাজার-লাখো কৃষকদের সঙ্গে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি হয় পুলিশের। বিক্ষোভকারীদের সরাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। মূলত পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে পুলিশ আন্দোলনকারী কৃষকদের আটকে দেয়। জবাবে ড্রোন থেকেও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ছুঁড়ে, জোর করে ট্রাক্টর দিয়ে সিমেন্টের ব্যারিকেড ভেঙে দেয় কৃষকরা। এরপরই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। দলে দলে কৃষক ব্যরিকেড ভেঙে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে চাইলে হরিয়াণা পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটায়, এর জেরে বেশ কিছু সংখ্যক কৃষক অসুস্থ হয়ে পড়েন। মূহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
শুধু পাঞ্জাব থেকেই দেড় হাজার ট্র্যাক্টর, ৫০০ গাড়ি নিয়ে দিল্লি অভিযানে আসছেন কৃষকরা। গাড়িতে করে প্রায় ছয় মাসের খাবার নিয়ে আসছেন তারা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চর্চা শুরু হয়েছে যে, তাহলে কি আরও একটি দীর্ঘ সময়ের কৃষক আন্দোলন দেখতে চলেছে দিল্লিসহ গোটা ভারত। ২০২০ সালে দিল্লির সীমানায় যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন কৃষকেরা, সেই আন্দোলন ১৩ মাস ধরে চলেছিল।

মঙ্গলবার রাতে কৃষক নেতারা বিরতির ঘোষণা দিয়ে বলেন, তারা সকালে আবার পদযাত্রা শুরু করবেন। সে অনুযায়ী বুধবার সকাল হতেই, রাজ্যের সীমান্ত বন্ধ, জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড, দিল্লিতে ১৪৪ ধারা জারির পরও পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মধ্যবর্তী শম্ভু সীমান্ত থকে পূর্বঘোষিত 'দিল্লি চলো' রোডমার্চ শুরু করেন ভারতের কৃষকরা। এ সময় কৃষকদের ওপর প্লাস্টিক ও রাবার বুলেট ছোড়ার অভিযোগই উঠেছে।
বুধবার সকালে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের দূরে রাখতে দিল্লি সীমান্তে হাজার হাজার দাঙ্গা পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। শম্ভু সীমান্তে কৃষকরা নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক চশমা বিতরণ করছেন, কারণ পুলিশ টিয়ারশেল ছুড়ে তাদের থামাতে চাইছিলো। তবে সব বাধা উপেক্ষা করেই পদযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন ভারতের কৃষকরা।
এ সময় কৃষক নেতারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন মিডিয়াতে এমনভাবে খবর প্রচার করা হচ্ছে যাতে মনে হতে পারে কৃষকরা সন্ত্রাসী অথবা তারা বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কৃষকনেতা সারওয়ান সিং বলেন, অন্য কারো সঙ্গে আমাদের কিছুই করার নেই। শুরু থেকেই আমাদের একই দাবি। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, এমএসপির জন্য আমাদের আইন করে দেওয়া হোক।
কৃষকদের এই রোডমার্চ ঠেকাতে ইতোমধ্যে রাজধানী দিল্লিকে নিরাপত্তা চাঁদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। দিল্লিতে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে পুলিশ। কৃষকরা যাতে ট্রাক্টর, ট্রাক ও ট্রলি নিয়ে সড়কে নামতে না পারে সেজন্য জায়গায় জায়গায় বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে কোনো জমায়েত ও সমাবেশ। নজরদারি চালানো হচ্ছে আকাশ থেকেও। সব মিলিয়ে মারমার-কাটকাট অবস্থা দিল্লিতে।

ফসলের নূন্যতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে ‘দিল্লি চলো’ অভিযানের ডাক দেয় পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ একাধিক রাজ্যের কৃষকরা। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা, কিষাণ মজদুর মোর্চাসহ কৃষকদের ২০০টির বেশি সংগঠন এই দিল্লি চলো কর্মসূচিতে সামিল হয়েছে। হাজার হাজার কৃষক ট্রাক্টরে চেপে দিল্লি চলো অভিযানে যোগ দিয়েছেন। দলে দলে কৃষকরা ব্যরিকেড ভেঙে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গোটা এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে সরকার। কৃষক অভিযান প্রতিরোধে দিল্লির সঙ্গে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সংযোগকারী সব রাস্তা সোমবার ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় সময় রাত থেকে বন্ধ করে দেয় দিল্লি পুলিশ। সিঙ্ঘু সীমান্ত, টিকরি সীমান্ত এবং গাজিপুরে রারারাতি গড়ে তোলা হয় অস্থায়ী জেল। রাজধানীমুখী বেশিরভাগ রাস্তায় বসানো হয় কাঁটাতারের ব্যারিকেড।
ভারতীয় সংবামাধ্যমগুলো আশঙ্কা করছে, কৃষকদের এবারের প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে আবারও একটি দীর্ঘ আন্দোলনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দিল্লি। ২০২০ সালে দিল্লির সীমানায় যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন কৃষকেরা, সেই আন্দোলন ১৩ মাস ধরে চলেছিল। এবারও কৃষকেরা সেই পথেই হাঁটতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাই আগেভাগেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে দিল্লির সীমানা।

