ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া নিহত হয়েছেন। ইরানের রাজধানী তেহরানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। হামাসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ইসমাইল হানিয়ার নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তেহরানে হানিয়ার বাসভবনে ইসরাইল হামলা চালালে তিনি নিহত হয়েছেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে এখনো কোনো বিবৃতি দেয়নি। ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও কোনো মন্তব্য এখনো আসেনি। এর আগে মঙ্গলবার, হানিয়া ইরানের নতুন রাষ্ট্রপতির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে দেখা করেন।
চলতি বছর হামাসের রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন হানিয়া। সেই ২০১৭ সাল থেকে হামাসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী হানিয়া গাজা, ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং প্রবাসে হামাসের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। গত দুই বছর তিনি তুরস্ক ও কাতারে থেকেছেন।
৫৮ বছর বয়সী হানিয়া হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিনের ডানহাত ছিলেন। আহমেদ ইয়াসিন ২০০৪ সালে একটি ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হন। ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনি সংসদ নির্বাচনে হামাসের আশ্চর্যজনক বিজয়ের সময় হানিয়া সংগঠনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন। ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ পার্টিকে পরাজিত করেছিল হামাস।
কিভাবে ইসমাইল হানিয়ার উত্থান?
ইসমাইল আবদেল সালাম হানিয়ে, যার ডাক নাম আবু আল-আবদ, জন্মেছিলেন ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে। তিনি হামাস আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান এবং ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ সরকারের দশম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ইসমাইল হানিয়া মিশর অধিকৃত গাজার আল-শাতি উদ্বাস্তু শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ আরব-ইসরাইলি যুদ্ধের সময় তার বাবা মা বর্তমান ইসরাইলের অন্তর্গত আসকালানের নিকটস্থ বাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হন। তিনি গাজা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি সাহিত্যে স্নাতক হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তিনি হামাসে যোগ দেন।
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রথম ইন্তিফাদার সময় থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিক্ষোভে অংশ নেয়ার কারণে তিনি একাধিকভার গ্রেপ্তার হন ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। ১৯৮৯ সালে তিনি তিন বছরের কারাদন্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ৪০০ কর্মীর সাথে ইসরায়েল তাকে লেবানন পাঠিয়ে দেয়। এক বছর পর তিনি গাজায় ফিরে আসেন এবং ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন নিযুক্ত হন।
১৯৯৭ সালে আহমেদ ইয়াসিন ইসরাইল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হানিয়া তার দপ্তর পরিচালনের দায়িত্ব পান। ইয়াসিনের সাথে সম্পর্কের কারণে হামাসে তার খ্যতি বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষে নিয়োগ পান। ইয়াসিনের সাথে তার সম্পর্ক এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হামাসের অনেক নেতার হত্যাকান্ডের ফলে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় হামাসে তার অবস্থান আরো মজবুত হয়।
২০০৬ সালের ২৫ জানুয়ারি হামাস নির্বাচনে জয়ী পয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাহমুদ আব্বাসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং ২৯ মার্চ শপথ নেন। ২০০৭ সালের ১৪ জুন মাহমুদ আব্বাস হানিয়াকে পদচ্যুত করে সালাম ফাইয়াদকে নিয়োগ দেন।
২০১৭ সাল থেকে হামাস প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইসমাইল হানিয়া। পরে ২০২১ সালে টানা দ্বিতীয় বারের মতো হামাস প্রধান নির্বাচিত হন তিনি। গত বছরের অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান ইসরাইলি আগ্রাসনে পরিবারের বহু সদস্যকে হারান ইসমাইল হানিয়া। আর সবশেষ গুপ্তহত্যায় নিহত হলেন তিনি নিজেও।
