নেপালে জেন জি'র দেড় দিনের বিক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি গদি ছেড়েছেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পদত্যাগ করেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌডেল। এতেও থেমে থাকেনি বিক্ষোভকারীরা। সংসদ ভবন, ওলির ব্যক্তিগত বাড়ি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে মঙ্গলবার রাতেই নেপালের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগডেল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি দেশত্যাগের কিছুক্ষণ পরেই মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে জেনারেল সিগডেল বিক্ষোভকারীদের শান্ত হবার পাশাপাশি সংলাপের মাধ্যমে দেশে চলমান সংকট সমাধানের আহবান জানান। সেই সঙ্গে জানান, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেপালের নিরাপত্তা ও জানমালের দায়িত্বে থাকবেন তারা। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করা হয়েছে। সড়কে সড়কে নেমেছে সাঁজোয়া যান।

ওলি সরকারের পতনের পর কাঠমান্ডুর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও দেশটির তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবি তুলেছেন। গত তিন দশক ধরে রাজনৈতিক নেতাদের করা লুটের তদন্তের দাবিও তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘুনে ধরা সংবিধানের সংস্কারও চেয়েছেন তারা। আন্দোলনকারীরা আরও দাবি করেছেন, বিক্ষোভ চলাকালে প্রাণ হারানোদের সবাইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তবে আপাতত নেপালে চলছে সেনাশাসন। মঙ্গলবার তীব্র সহিংস বিক্ষোভের পর বুধবার সকাল থেকেই সেনা সদস্যরা কাঠমান্ডু এবং অন্যান্য শহরে নেমে পড়ে। তারা কারফিউ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। রাত থেকেই সেনাবাহিনী সারাদেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং রাজধানী কাঠমান্ডু ছাড়াও ললিতপুর ও ভক্তপুরে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে।
দেশে লুটপাট চালালে, ভাঙচুর করলে কড়া পদক্ষেপ করার বার্তাও দিয়েছে সে নেপালের সেনাবাহিনী। এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কিছু অসাধু গোষ্ঠী এই আন্দোলনের সুযোগ নিচ্ছে এবং সাধারণ নাগরিক ও সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি করছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার, শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছে সেনা। ব্যক্তিগত ও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট না করারও আবেদন হয়েছে।

নেপালের সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগডেলও বিক্ষোভকারীদের আলাপ-আলোচনার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশবাসীর উদ্দেশে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে সিগদেল বলেন, আমরা প্রতিবাদীদের বিক্ষোভ, কর্মসূচি বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্দেশ্যে আলাপ-আলোচনার জন্য এগিয়ে আসার আবেদন করছি। বর্তমানে তৈরি হওয়া কঠিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে আমাদের।

সূত্রের খবর, নেপালের সেনাপ্রধান সিগডেলই মঙ্গলবার নেপালের সদ্যপ্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সঙ্গে দেখা করে তাকে ইস্তফা দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কে এই সিগদেল? তাকে নিয়ে ইতিমধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনমানসে। বলাবলি হচ্ছে, যদি নতুন ও নিরপেক্ষ রাজনীতিকরা নেপালের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে আপাতত নেপালকে জেনারেল সিগডালের অধীনেই থাকতে হবে।
নেপালের রূপানদেহিতে ১৯৬৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিগডেলের জন্ম। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কমিশন লাভ করেন। চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি থেকে কৌশলগত গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন সিগডেল। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ-ও করেন।
নেপাল, চীন এবং ভারত- তিন দেশেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন নেপালের সেনাপ্রধান। ভারত থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়েও পড়াশোনা করেছেন তিনি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসাবে যুগোস্লাভিয়া, তাজিকিস্তান এবং লাইবেরিয়ায় দায়িত্বপালন করেছেন সিগডেল।
নেপালের ইনস্পেক্টর জেনারেল, সেনার সামরিক অভিযান প্রধান এবং ব্যাটলিয়ন, ব্রিগেড এবং ডিভিশনের কমান্ডার হিসাবেও দায়িত্বপালন করেছেন সিগডেল। ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সিগদেলকে নেপালের ৪৫তম সেনাপ্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল। অর্থাৎ, সিগডেল নেপালের সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক এক বছরের মাথায় অশান্ত হল সে দেশ।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফরে গিয়েছিলেন জেনারেল সিগদেল। সে সময় তাকে ভারতীয় সেনার সম্মানসূচক জেনারেল পদমর্যাদা প্রদান করেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। সেই সিগডেলই এখন নেপালে শান্তি ফেরানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে এইন সফরের আগে চীনেও গিয়েছিলেন সিগডেল।
উল্লেখ্য, ছাত্র-যুব গণবিক্ষোভের রোষে পুড়ছে নেপাল। সামাজিক মাধ্যমের উপর সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরই অশান্তির আগুন ছড়াতে শুরু করে নেপালে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ অন্য চেহারা নেয় মঙ্গলবার। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেও কোনও লাভ হয়নি। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে নেপাল। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। জনরোষের মুখে পড়ে নেপাল সরকার।

মঙ্গলবার রোষের আগুন দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বহু সরকারি ভবন, নেতা-মন্ত্রীর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মারধরও করা হয় নেতা-মন্ত্রীদের। ভাঙচুর করা হয় সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট এবং পার্লামেন্ট ভবন। পরে পার্লামেন্ট ভবনেও আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। অশান্ত পরিস্থিতিতে মঙ্গলবারই নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন কেপি শর্মা ওলি।
নেপালে জানমাল ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলো সেনাবাহিনী
নেপালে সরকার পতনে কেন্দ্রে থাকা ‘নেপো কিডস’ কারা?
রাশিয়ার ‘আগ্রাসনের’ নিন্দা জানালো পোল্যান্ড সেনাবাহিনী