লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি গত মঙ্গলবার লিবিয়ায় আততায়ী হামলায় নিহত হয়েছেন। ৫৩ বছর বয়সী সাইফকে উত্তর-পশ্চিমের শহর জিন্তানে তাঁর নিজ বাসভবনের বাগানে গুলি করে হত্যা করা হয়। সৌদি আরব ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া এ খবর নিশ্চিত করেছে। সাইফ আল-ইসলামকে দেশটির এই প্রজন্মের শক্তিশালী নেতা হিসাবে ধরা হতো।
লিবিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, চারজন হামলাকারী তাঁর বাড়িতে জোরপূর্বক ঢুকে পড়ে, নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো অকেজো করে দেয় এবং হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। তবে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা ছিল, সে বিষয়ে সাইফের ফরাসি আইনজীবী এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি।
গত এক দশক ধরে সাইফ আল-ইসলাম জিন্তানেই বসবাস করছিলেন। একসময় বাবার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত সাইফের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ২০২১ সালে তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবার পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও দেশটির নির্বাচন অনির্দিষ্টকাল স্থগিত হয়ে যায়।

কে ছিলেন সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি?
১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করা সাইফ ছিলেন লিবিয়ার দীর্ঘ সময়ের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির দ্বিতীয় ছেলে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৬৯ সাল থেকে ২০১১ সাল, বিক্ষোভকারীদের হাতে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটি শাসন করেছিলেন।
সাইফ ১৯৯৪ সালে ত্রিপোলির আল ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। পরবর্তীতে ভিয়েনার ইমাদেক বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও ২০০০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত লিবিয়ার ‘ডি ফ্যাক্টো’ প্রধানমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগের বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সফল মধ্যস্থতা করেছিলেন এবং লকারবি বিমান হামলায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়েও আলোচনা চালিয়েছিলেন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি অর্জন করা সাইফ ব্যক্তিগত জীবনে বেশ শৌখিন ছিলেন। তিনি বাঘ পুষতেন, বাজপাখি নিয়ে শিকার করতেন এবং লন্ডনের উচ্চবিত্ত সমাজে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
২০১১ সালে যখন লিবিয়ায় ‘আরব বসন্ত’ শুরু হয়, তখন তিনি তাঁর বাবার শাসনামলের কট্টর রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি বিদ্রোহীদের শেষ পর্যন্ত লড়াই করার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা লিবিয়াতেই লড়ব এবং লিবিয়াতেই মরব। সে সময় আন্দোলনকারীদের নৃশংসভাবে দমনের পরিকল্পনার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হয়।
২০১১ সালের ১৯ নভেম্বর দক্ষিণ লিবিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তাঁর শরীরে জখম এবং হাতের আঙুল কাটা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল।
জিন্তানের স্থানীয় মিলিশিয়ারা তাঁকে কয়েক বছর বন্দি করে রাখে। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত অনুপস্থিতিতেই তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। তবে ২০১৭ সালে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কর্তৃপক্ষের জারি করা এক সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় প্রায় ছয় বছর বন্দি থাকার পর তিনি মুক্তি পান।
