কিয়েভে ইউক্রেনের শহীদ সৈনিকদের সম্মানে উৎসর্গ করা একটি স্মৃতিদেয়ালে নিজের স্বামীর প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে আছেন ওকসানা বোরকুনগোলার বারুদ আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের আড়ালে ইউক্রেন এক দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়াবহ জনতাত্ত্বিক সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধের চার বছরে দেশটির জন্মহার তলানিতে ঠেকেছে, যার ফলে ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের ময়দানে প্রাণহানি, লাখ লাখ মানুষের দেশত্যাগ এবং মানসিক ও শারীরিক চাপে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার মতো বিষয়গুলো ইউক্রেনকে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ওলেনা বিলোজেরস্কা এবং তাঁর স্বামীর গল্পটি ইউক্রেনের হাজারো দম্পতির প্রতিচ্ছবি। ২০১৪ সালে যখন পূর্ব ইউক্রেনে প্রথম সংঘাত শুরু হয়, তখন ওলেনার বয়স ছিল ৩৪। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও দেশের টানে তারা যুদ্ধে যোগ দেন। ৪১ বছর বয়সে যখন তিনি সেনাবাহিনী ছাড়েন, চিকিৎসকরা জানান তাঁর মা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তবুও হাল ছাড়েননি ওলেনা।

কিয়েভের ‘নাদিয়া’ (ইউক্রেনীয় ভাষায় যার অর্থ আশা) ক্লিনিকে আইভিএফ পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁর একটি মাত্র ভ্রূণ সংরক্ষিত করা হয়। ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার রুশ আক্রমণের সময় ওলেনাকে আবারও ফ্রন্টলাইনে ফিরতে হয়। দীর্ঘ তিন বছর পর ৪৬ বছর বয়সে তিনি জন্ম দেন পুত্রসন্তান ‘পাভলুস’-এর। ওলেনার মতে, তাঁর এই সন্তান 'ঈশ্বরের উপহার'।
ইউক্রেনের শীর্ষস্থানীয় জনতত্ত্ববিদ এলা লিভানোভা এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের শুরু থেকে ইউক্রেন প্রায় এক কোটি মানুষ হারিয়েছে, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশ শরণার্থী হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে অথবা রুশ অধিকৃত এলাকায় বসবাস করছে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশে জন্মহার কমলেও ইউক্রেনে তা বর্তমানে একের নিচে নেমে এসেছে (ইউরোপে গড় ১.৪ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১.৬)।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নারীদের অকাল মেনোপজ এবং পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান হ্রাস পাচ্ছে। ‘নাদিয়া’ ক্লিনিকের পরিচালক ডক্টর ভ্যালেরি জুকিন জানান, গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণগুলোর জিনগত পরীক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে।

ইউক্রেন সরকারিভাবে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ না করলেও মার্কিন থিংক ট্যাংক সিএসআইএস’র মতে, গত চার বছরে প্রায় ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ইউক্রেনীয় নিহত হয়েছেন। যেহেতু দেশটির গড় সেনার বয়স ৪৩ বছর, তাই নিহতদের বেশিরভাগই বিবাহিত। ফলে ইউক্রেন আজ ‘বিধবা ও এতিমদের দেশে’ পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫৯ হাজার শিশু তাদের জৈবিক পিতামাতা ছাড়াই বেড়ে উঠছে।
ইরিনা ইভানোভার গল্পটি অত্যন্ত করুণ। তাঁর স্বামী পাভলো ইভানোভ ছিলেন একজন চৌকস এফ-১৬ পাইলট। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাভলো যখন নিহত হন, ইরিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মৃত্যুর আট মাস পর জন্ম নেয় তাঁদের কন্যা ‘ইউস্তিনা’। ইরিনা আক্ষেপ করে বলেন, সবচেয়ে বেশি আনন্দ আর সবচেয়ে বেশি বেদনা এখন আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যুদ্ধের কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ, যাদের বেশিরভাগ তরুণী ও শিশু, বিদেশে স্থায়ী হতে শুরু করেছেন। যুদ্ধের সময় যত বাড়বে, তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা ততই কমবে। এটি ইউক্রেনের জন্য এক ভয়াবহ ‘মেধা পাচার’। যুদ্ধ পরবর্তী দেশ পুনর্গঠনের জন্য যে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, তা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ওকসানা বোরকুনের মতো যুদ্ধ-বিধবারা এখন এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসছেন। তাঁদের অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপে বর্তমানে ৬ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে। তাঁরা শুধু নিজেদের শোক ভাগ করে নিচ্ছেন না, বরং শহীদ সেনাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ শেষ হলেও ইউক্রেনের এই জনসংখ্যাগত ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক সময় লাগবে। মানুষ ছাড়া একটি রাষ্ট্র টিকে থাকা অসম্ভব, লিভানোভার এই সতর্কবার্তা এখন ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
