যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অত্যাধুনিক বোমাবর্ষণ এবং কোটি কোটি ডলারের সামরিক কৌশলকে ‘বুলডোজার আর ডাম্প ট্রাকের’ মতো সাধারণ কিছু নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে নস্যাৎ করে দিয়েছে ইরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, বেশ দ্রুত গতিতেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইরান।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত কয়েক মাসের টানা হামলায় ইরানীয় ক্ষেপণাস্ত্রের প্রবেশপথগুলো ধ্বংস করা হলেও, তেহরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের ভূগর্ভস্থ গোপন মিসাইল ঘাঁটিগুলো পুনরায় সচল করে ফেলেছে, যা আমেরিকার বোমাবর্ষণ কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইসরাইল মূলত ইরানের ভূগর্ভস্থ মিসাইল ঘাঁটিগুলোর সুড়ঙ্গপথের মুখ এবং সংযোগকারী সড়কগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল, যাতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যানগুলো বাইরে বের করতে না পারে।
কিন্তু সিএনএন-এর হাতে আসা এয়ারবাসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির পর গত সাত সপ্তাহে ইরান তাদের উদ্ধারকাজ ব্যাপক ত্বরান্বিত করেছে। মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১৮টি ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির ৬৯টি সুড়ঙ্গপথের মধ্যে ৫০টিই ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ সচল করে ফেলেছে তেহরান।

জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার সিএনএন’কে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী হয়তো ক্ষণস্থায়ী বা কৌশলগত সাফল্য দেখাতে পারদর্শী, যার বড় উদাহরণ ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে টানেলের ভেতর আটকে রাখা। কিন্তু এর পেছনে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্য না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত তা একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তিনি আরও জানান, যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও যদি পুনরায় সংঘাত শুরু হয়, তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ইরানের কাছে যে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে তারা অনায়াসে হামলা চালিয়ে যেতে পারবে।

টেলিভিশন ও স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কেরমানশাহ এবং দেজফুল অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতে মার্কিন হামলায় তৈরি হওয়া বিশাল বিশাল গর্তগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় রাস্তা নতুন করে পাকা করা হয়েছে। ইসফাহান ও খোমেইনের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে গত এপ্রিল ও মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেখা গেছে, অন্তত ১০ থেকে ১৮টি বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাক দিনরাত কাজ করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সুড়ঙ্গপথ উন্মুক্ত করছে।
অথচ এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মার্চ মাসে তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, লাঞ্চার এবং এর সাথে সম্পর্কিত সবকিছু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। এমনকি গত ৮ এপ্রিল দুই দেশের যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরান এখন তাদের বাকি থাকা লাঞ্চারগুলো টেনেহিঁচড়ে বের করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেগুলো প্রতিস্থাপন করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ ওদের প্রতিরক্ষা শিল্প বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন হেগসেথের এই দাবিকে ভুল প্রমাণিত করছে। হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা গবেষক তৈমুর কাদিশেভ বলেন, ইরান গত ২০ বছর ধরে এই ধরণের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মাটির শত শত মিটার গভীরে পাথরের আস্তরণের নিচে থাকা তাদের মূল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার বা প্রায় এক হাজারটি মিসাইল মার্কিন বোমাবর্ষণে অক্ষত রয়ে গেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রও সিএনএন’র কাছে স্বীকার করেছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের ধারণা বা টাইমলাইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরান অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে, যার মধ্যে ড্রোন উৎপাদন এবং মিসাইল লাঞ্চার প্রতিস্থাপন অন্যতম।
কাদিশেভ প্রযুক্তির এই অসম যুদ্ধকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইরানের এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটির ক্ষতি করতে পশ্চিমাদের অত্যন্ত জটিল এবং চরম ব্যয়বহুল আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। অথচ ইরান সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে অত্যন্ত সাধারণ ও কম খরচের প্রযুক্তি দিয়ে—যা স্রেফ কিছু বুলডোজার!
আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ যখন দিন দিন ফুরিয়ে আসছে, তখন ইরানের এই দ্রুত পুনরুত্থান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের অক্ষত মজুদ মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য নতুন করে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
