নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সোমবার পরমাণু অস্ত্র অসংযুক্তি চুক্তির (এনপিটি) পর্যালোচনা সম্মেলনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এক তীব্র বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং সম্মেলনটির অন্যতম সহ-সভাপতি হিসেবে তেহরানের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দুই দেশের এই কূটনৈতিক সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ১১তম এই পর্যালোচনা সম্মেলনে ৩৪ জন সহ-সভাপতির মধ্যে ইরান অন্যতম দেশ হিসেবে মনোনীত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এর তীব্র বিরোধিতা করেছে।
পরমাণু অস্ত্র অসংযুক্তি চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় মাসব্যাপী এই সম্মেলনটি সোমবার ভিয়েতনামের জাতিসংঘ দূত দো হুং ভিয়েতের সভাপতিত্বে শুরু হয়। সেখানে ‘জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন’ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে সহ-সভাপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরমাণু অসংযুক্তি ব্যুরোর সহকারী সচিব ক্রিস্টোফার ইয়াও এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি ইরানের অন্তর্ভুক্তিকে এনপিটির জন্য একটি ‘অপমান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তির শর্তাবলি লঙ্ঘন করে আসছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সাথে অসহযোগিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এমন একটি দেশকে নীতিনির্ধারণী পদে বসানো পুরো সম্মেলনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন আইএইএ’তে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি। তিনি পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের একমাত্র দেশ যারা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং বর্তমানেও তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার আধুনিকায়ন করছে। এমন একটি দেশের অন্য কোনো দেশের শর্ত পালনের বিচারক হওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। ইরানের দাবি, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

দুই মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধের মূলে রয়েছে এই পরমাণু ইস্যুটিই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানকে কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। এই উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার ইরানি সূত্রগুলো যুদ্ধের অবসানে তেহরানের সবশেষ প্রস্তাবটি প্রকাশ করেছে। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করা যাবে না।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাব মানতে নারাজ। সোমবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৈঠক করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং সেটি ইরানকেও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
পশ্চিমা শক্তিগুলোর আশঙ্কা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের আড়ালে ইরান মূলত পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকেই এগোচ্ছে, যদিও তেহরান শুরু থেকেই এই দাবি অস্বীকার করে আসছে। সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের এই সম্মেলনটি এখন বিশ্বশান্তির চেয়েও বড় দুই শক্তির ক্ষমতার লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
আবারও অনিশ্চিয়তায় ওয়াশিংটন তেহরান শান্তি আলোচনা