ইরানিরা এখন এক ত্রিমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন, একদিকে চার সপ্তাহ ধরে চলা মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের ভয়াবহতা আর তেহরানের পাল্টা হামলা; অন্যদিকে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবং দেশটির ইতিহাসে দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট।
কাতারভিক্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ফার্সি নববর্ষ 'নওরোজ' উপলক্ষ্যে চলতি সপ্তাহে দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তবে ইরানিদের জন্য এই বছরটি ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত শাটডাউনের বছর। গত জুনে ইসরাইল ও আমেরিকার সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ, জানুয়ারির রক্তক্ষয়ী দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণ- সব মিলিয়ে জনজীবন বারবার স্থবির হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য গত এক বছর ছিল চরম হতাশার। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী আল জাজিরাকে জানান, নওরোজের আগে আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়ার কথা, কিন্তু এবার ব্যবসা হয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। ছুটির পর দোকান খুললে কী হবে, তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়।" নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা কয়েক বছর ধরেই কমছে। যুদ্ধের ঠিক আগে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৭০ শতাংশ, আর খাদ্যের ক্ষেত্রে তা ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বাজারে নিত্যপণ্যের অভাব না থাকলেও আকাশচুম্বী দাম দেখে অনেক ক্রেতাকেই এখন দোকানে দাঁড়িয়ে হিসাব মেলাতে দেখা যায়। যুদ্ধের আতঙ্কে অনেক পরিবার তেহরান ছেড়ে চলে গেছে এবং তাদের সঞ্চয় এখন শেষের পথে।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও মানসিক যন্ত্রণা
টানা ২৫ দিন ধরে দেশটির ৯০ কোটিরও বেশি মানুষ বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন। এটি শুধু তথ্যের প্রবাহকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং ক্ষুদ্র ও অনলাইন ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে গয়না বিক্রি করা এক তরুণী আক্ষেপ করে বলেন, এবার ইন্টারনেট কবে ফিরবে, তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। এটা শুধু অপমানজনকই নয়, বরং আমাদের ব্যবসাগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও দমন-পীড়ন
বিক্ষোভকারীদের সাথে সংহতি জানানোর অপরাধে অনেক বেসরকারি ব্যবসার অনলাইন পেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এমনকি বিদেশে অবস্থানরত অভিনেতা বরজু আরজমান্দ-এর মতো ব্যক্তিদেরও ‘শত্রু রাষ্ট্রের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে তাদের সম্পদ ক্রোক করছে বিচার বিভাগ। এছাড়া যুদ্ধের ফুটেজ বা রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টের ভিডিও বাইরে পাঠানোর অপরাধে ধরপাকড় চলছে। সম্প্রতি এক তরুণীকে চোখ ও মুখ বেঁধে টেলিভিশনে ‘স্বীকারোক্তি’ দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যার অপরাধ ছিল নিজের জানালার পাশ থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও করা।

মৃত্যুদণ্ড ও অনিশ্চয়তা
জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, রাস্তায় নেমে কেউ বিক্ষোভ করলে তাকে ‘শত্রু’ হিসেবে গুলি করে মারা হবে। এদিকে, এই অঞ্চলের শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডার ব্র্যাড কুপার ইরানি বিক্ষোভকারীদের আপাতত ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে কোনো ‘সংকেত’ আসতে পারে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের দামামা আর অভ্যন্তরীণ দমনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ইরানিরা এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন।
