ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী অবরোধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাত এক চরম ও বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে 'পরাজয় মেনে নেওয়ার' আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘অত্যন্ত নির্দয় ও দুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে তেলের দাম সাময়িক বাড়লেও জনগণকে ধৈর্যের পরিচয় দিতে বলেছেন।
দুই দেশের মধ্যে মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ভূরাজনৈতিক সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের পাঁচভাগের একভাগ যা সরবরাহ হয় এই একমাত্র নৌপথ দিয়ে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা বা খোলা রাখার একমাত্র এখতিয়ার শুধু ইরানের হাতেই থাকবে। আপনারা যতক্ষণ না হারের বাস্তবতাকে মেনে নিচ্ছেন এবং কাল্পনিক চিন্তাভাবনা বন্ধ করছেন, ততক্ষণ ইরান এই অবরোধ কার্যকর রাখবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে কোনো আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা তাদের নেই। তিনি বলেন, প্রণালীতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তেহরানের দেওয়া শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। আরাকচি আরও উল্লেখ করেন যে আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪.০৮ ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।
তবে নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে ট্রাম্প মার্কিন জনগণকে কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং বিপজ্জনক দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার যে মূল্য, তার তুলনায় গ্যাসে সামান্য বাড়তি খরচ দেয়া একেবারেই তুচ্ছ। আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য এক বিশাল সেবামূলক কাজ করছি।
একই সাথে ট্রাম্পের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন, আগামী সপ্তাহে তেহরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে।

সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক তেল বাজারে পড়েছে। বিশ্ববাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক সপ্তাহে ৬ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৫.৪ শতাংশ বেড়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাধারণ সময়ে যেখানে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করত, সেখানে গত শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ এই এলাকা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে, যার একটিতেও অপরিশোধিত তেল ছিল না।
অনুমতি ছাড়া এই প্রণালী অতিক্রম করতে গিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে একের পর এক তেলের ট্যাঙ্কার। যুক্ত আরব আমিরাতের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ব্রিটেনের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার এই অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি লোহিত সাগরেও ছড়িয়ে পড়েছে সংঘাতের আগুন। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের মোচা বন্দরে ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করায় চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সৌদি আরবের নাজরান শহরে আরামকোর একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
সব মিলিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়া এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখোমুখি হতে চলেছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
