যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের একটি শপিং মলে সচারচরের একটি কর্মব্যস্ত দিন মুহূর্তেই যেন রূপ নিল এক বিভীষিকাময় রক্তাক্ত অধ্যায়ে। শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে উগ্র বর্ণবাদী ও চরমপন্থী এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন সোহেল নামের এক ভারতীয় তরুণ।
আদালতের নথির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারী ৪৮ বছর বয়সী পিটার মাইকেল লারসেন তদন্তকারীদের কাছে অকপটে স্বীকার করেছে, সে ‘মুসলিমদের হত্যা করতে চায়’ এবং মুসলিম জেনেই সে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সোহেলকে টার্গেট করেছিল।

গত সোমবার ওয়েস্ট ভ্যালি সিটির ভ্যালি ফেয়ার মলের ভেতরে এ লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ জানায়, লারসেন মলের একটি ছোট দোকান কর্মরত সোহেলের কাছে গিয়ে প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে চায়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সে আচমকা পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে সোহেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘাতক লারসেনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই হত্যাচেষ্টা এবং নিষিদ্ধ বিপজ্জনক অস্ত্র বহনের অভিযোগ এনে সল্টলেক কাউন্টি জেলে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং পাশের একটি জুয়েলারি দোকানের কর্মী লুনা নুনেস স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, লারসেন প্রথমে সোহেলকে জিজ্ঞেস করেছিল সে কোথা থেকে এসেছে। সোহেল অত্যন্ত ভদ্রভাবে উত্তর দেন, আমি ভারত থেকে এসেছি, আমার নাম সোহেল। এরপর লারসেন জিজ্ঞেস করে, তুমি কি মুসলিম? সোহেল ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেয়া মাত্রই লারসেন কোনো কিছু না ভেবেই তাঁকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে শুরু করে।

ইউটাহ ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শুয়াইব দিন জানান, লারসেন প্রথমে সোহেলের কাছে এক বোতল পানি চেয়েছিল। সোহেল যখন পানি দেয়ার জন্য পেছন ঘোরেন, তখনই পেছন থেকে কাপুরুষের মতো ছুরি বের করে হামলা চালায় ওই বর্ণবাদী। সোহেলের চিকিৎসার জন্য খোলা একটি অনলাইন ফান্ডরাইজিং পেজ থেকে জানা গেছে, ঘাতক লারসেন সোহেলকে বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৫ বার ছুরিকাঘাত করেছে। একাধিক অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মলের সাধারণ ক্রেতা এবং অন্য কর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লারসেনকে জাপটে ধরেন এবং মাটিতে ফেলে আটকে রাখেন। ফলে এক বড় ধরনের গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পান মলের বাকি মানুষরা। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, লারসেনের কাছে আরও বড় ধরণের নাশকতার পরিকল্পনা ও উগ্রবাদী নথিপত্র পাওয়া গেছে, যা জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ।
সোহেলের সহকর্মী লুনা নুনেস সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি চারণ করে বলেন, আমি লারসেনের ওপর জুতো, চেয়ার, যা হাতের কাছে পাচ্ছিলাম তা-ই ছুঁড়ে মারছিলাম তাকে থামানোর জন্য। সে এত নির্মমভাবে সোহেলকে কোপাচ্ছিল যে আমি ভেবেছিলাম সোহেল আর বাঁচবে না। পরে মলের অন্য কর্মীরা জানান, লারসেন ছুরিকাঘাত করার আগে মলের চারপাশ ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মানুষের ধর্ম জিজ্ঞেস করছিল।

পরিবার ও বন্ধুদের কাছে সোহেল একজন অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমি এবং হাসিখুশি মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর ম্যানেজার আদনান মোহাম্মদ এই বর্বরোচিত ঘৃণ্য অপরাধের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি সম্পূর্ণ উন্মাদনা। এই সমাজে ঘৃণার কোনো স্থান নেই। সোহেল সব সময় হাসিমুখে কঠোর পরিশ্রম করত, তাই আমি তাকে ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দিয়েছিলাম। যখন আপনি একজন মানুষকে হত্যা করেন, তখন কেবল একজনকে মারেন না, পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেন। আমি যদি তখন সেখানে থাকতাম, তবে নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমার ভাইকে রক্ষা করতাম।
জানা গেছে, সোহেলের কোনো স্বাস্থ্য বীমা (হেলথ ইন্সুরেন্স) নেই। তিনি তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর ঘরে স্ত্রী এবং দুটি ছোট ছোট দুগ্ধপোষ্য শিশু রয়েছে, যাদের দেখভাল করার মতো এখন আর কেউ নেই। এই ঘটনার পর আমেরিকার মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশটিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ইসলামোফোবিয়া ও মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
