ভারতের আধুনিক চিত্রকলার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী আর নেই। রোববার সকালে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শিল্পী গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রক্তের ক্যানসারে (ব্লাড ক্যানসার) ভুগছিলেন এবং তাঁর নিয়মিত চিকিৎসাও চলছিল। গত ১৪ মাসে তাঁকে একাধিকবার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি মূত্রনালির সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে, যার ফলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসক তুফান কান্তি দোলাইয়ের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছিল।

স্বতন্ত্র রেখা ও অনন্য শৈলীর জাদুকর
ছবিতে অভিনব রেখার ব্যবহার এবং মানুষের শরীরের নানা ভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ দক্ষতার জন্য শিল্পজগতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন যোগেন চৌধুরী। তাঁর আঁকার ধরন ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। রেখার নিপুণ টান ও আড়াআড়ি দাগের চমৎকার মাধ্যমের সাহায্যে তিনি মানুষের শারীরিক গঠনের পাশাপাশি মনের গভীরের আবেগ ও নানা অনুভূতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলায় নিজের এই অভিনব শৈলীর মাধ্যমে তিনি এক অনন্য উচ্চতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

শিক্ষক, লেখক ও প্রশাসক হিসেবেও বর্ণিল অবদান
চিত্রকলার জগতেই কেবল তাঁর অবদান সীমাবদ্ধ ছিল না; শিল্পচর্চার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষর। তিনি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের সংগ্রহশালায় ‘অবেক্ষক’ (কিউরেটর) হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী কলাভবনে অধ্যাপক ও অধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন।
শিল্পভাবনা, সমাজ, পরিবেশ, শিল্পকলা শিক্ষা এবং সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর এসব মননশীল লেখা দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি গ্রন্থাকারেও প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি সাহিত্যচর্চার অংশ হিসেবে তিনি কবিতাও লিখেছেন।

দেয়ালে ছবি এঁকে শিল্পযাত্রার শুরু
কলকাতায় পরিবারের সঙ্গে জীবনের শুরুর দিনগুলোতে কাকার বাসভবনের দেয়ালে ছবি আঁকার মাধ্যমেই যোগেন চৌধুরীর শিল্পচর্চার এক অনন্য অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই শৈশবের দেয়ালচিত্রের পথ পেরিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভারতের আধুনিক চিত্রকলার এক পরিচিত ও স্বতন্ত্র নাম। একজন উচ্চাঙ্গের শিল্পী ছাড়াও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও শিল্পভাবুক হিসেবে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
