ওয়েস্ট সাইড স্টোরি। অস্কার জেতা পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া মিউজিক্যাল মুভি। সেই মুভি'র টেলিভিশন ট্রেলার তৈরি করেছেন, বাংলাদেশের তরুণ গ্রাফিক্স ডিজাইনার কামরুল হাসান জিসান।
শুধু কি তাই, জিসানের হাতে তৈরি হয়েছে ডক্টর স্ট্রেইঞ্জ, ব্যটম্যান, মরবিয়াসসহ হলিউডের ব্লকবাষ্টার সব কনটেন্টের ট্রেলার। ভবিষ্যতে এই তরুণ হতে চান হলিউডের আর্ট ডিজাইনার।
লস এঞ্জেলসের বিখ্যাত ট্রেলার স্টুডিও ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভ গ্রুপের একজন ফুলটাইম গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে এক বছরেরও কম সময়ে, জিসানের অভিজ্ঞতায় জমা হয়েছে মার্ভেল পিকচার থেকে শুরু করে স্টিভেন স্পিলবার্গের মুভির ট্রেলার।
লাস্ট নাইট ইন সোহো, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেসসহ বেশ কিছু সিনেমার ট্রেলার ও টিজারে মোশন গ্রাফিক্সের কাজ করেছেন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার জিসান কামরুল হাসান। তবে এখানেই থেমে যেতে নারাজ তিনি।
জিসান বলেন, আমি নিজেও একসময় ডুবে থাকতাম হলিউডের সিনেমায়। তবে সিনেমার চেয়ে আমায় বেশি টানত ট্রেলার ও টিজার। কখনও ভাবিনি নিজেই হলিউডে এসে এমন কাজ করব।
তিনি আরও বলেন, আসলে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা পরিচালকের সঙ্গে নয়, আমি কাজ করি সিনেমার মার্কেটিং টিমের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে আইডিয়া শেয়ার এবং তাঁদের আইডিয়া নিয়ে সিনেমার ট্রেলার-টিজারে মোশন গ্রাফিক্সের কাজ করি।
২০১৬ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমানো জিসানের এই পথটি সহজ ছিল না। সিনেমা বিষয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থী শুধু স্বপ্ন আর পরিশ্রমকে সাথী করে জায়গা করে নিয়েছে লস এঞ্জেলসে।
হলিউড যাত্রার প্রসঙ্গে কামরুল হাসান বলেন, ২০০২ সালে দ্য লর্ড অব দ্য রিংস সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যে মোশন গ্রাফিক্সের কাজ দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। পরে সিদ্ধান্ত নিই মোশন গ্রাফিক্সের কাজ শেখার। ২০০৭ সালে ফটোশপের এক মাসের কোর্স করি লাকসামে।
পরে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে ইউটিউব দেখে ফটোশপের অ্যাডভান্স কাজ শিখতে শুরু করি। ২০১২ সালে মেস রুমমেটের ভাই গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ দেন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করি।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে পাড়ি দিই। এখানে এসে স্থানীয় এক পত্রিকায় গ্রাফিক্স ডিজাইনারের কাজও পাই। তবে পেশাগত কাজে তেমন জ্ঞান না থাকায় শুরু হয় কঠোর পরিশ্রমের দিন।
মাত্র ২০০ মার্কিন ডলার সম্বল করে নিউইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলসে স্বপ্ন সত্যি করতে আসা এই তরুণ বলছেন, তিনি মনে করেন না, হলিউডে কাজ করতে সিনেমায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে।
কামরুল হাসান জিসাস বলেন, ২০১৭ সালে নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে আসি লস অ্যাঞ্জেলেসে। চাকরি নিয়ে এখানেই থাকতে শুরু করি। করোনায় চাকরি ছেড়ে ভিডিও টিউটোরিয়াল থেকে মোশন গ্রাফিক ডিজাইন শিখতে শুরু করি।
পাশাপাশি চলচ্চিত্রের গ্রাফিক্সে প্রয়োজনীয় নতুন সফটওয়্যার, যেমন- আফটার ইফেক্টস, সিনেমা ফোরডি, হুডিনি ও নিউকের কাজ শিখতে শুরু করি। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এসবের পেছনে দৈনিক ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা ব্যয় করেছি আমি। তবু হাল ছাড়িনি।
তিনি বলেন, এরপর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নিজের শো রিল প্রস্তুত করি। আর আগস্ট মাসে মোশন গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন পাঠাতে শুরু করি। প্রতিদিন ৩০-৪০টি প্রযোজনা সংস্থার কাছে নিজের পোর্টফোলিও পাঠাতাম।
প্রথম কয়েক মাস কোনো প্রযোজনা সংস্থার কাছ থেকে সাড়া পায়নি। তিন মাস পর ওয়াইল্ড কার্ড ক্রিয়েটিভ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং চাকরির জন্য নির্বাচন করে। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে এই প্রতিষ্ঠানেই কাজ করছি।
অভিজ্ঞতায় জিসান শিখেছেন, যত সহজ তত কঠিন। ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখেন একজন আর্ট ডিজাইনার বা শিল্প পরিচালক হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব জেতার। তার ভাষায়, এই স্বপ্ন কেবল দেখছিই না, এটি বাস্তবায়নের পথেও হাঁটছি। নিচ্ছি প্রস্তুতি, করছি পরিশ্রমও।
একাত্তর/এআর
