তীব্র রোদ, টপটপ করে ঘাম ঝরছে ইয়াসিনের। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ানবাজারের মূল রাস্তায় একধারে দাঁড়িয়ে গাড়ির গতি কমার অপেক্ষায় ১১ বছর বয়সী এই ছেলে। রাস্তার অন্যপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের দু’টা বোতল কুড়িয়ে নেবার জন্য সতর্ক দৃষ্টি তার।
গাড়ির গতি একটু কমতেই রাস্তা পার হয়ে বোতল দুটো কুড়িয়ে কাঁধে থাকা বস্তায় ভরে নেয়। এবার একটু ফুরসত মেলে কথা বলার। ইয়াসিন জানায়, গেলো বছর করোনার সময় এলাকার বড় ভাইদের সাথে এক চর এলাকা থেকে ঢাকায় আসে সে।
প্রথম বাজারে কুলি হবার চেষ্টাও চালায় কিছুদিন। কিন্তু ছোটমানুষ কতইবা ভার বইতে পারবে , এই চিন্তায় কাজে নিতো না কেউ। অবশেষে টোকাই হবার ‘চাকরি’ মেলে তার। সারাদিন ময়লা কুড়িয়ে দিনশেষে আশি থেকে একশ টাকা পাওয়া যায়।

এরমধ্যে খাবার খরচ চলে যায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। রাতে বাজারের টুকরীর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়া যায় সেজন্যও দশ টাকা দিতে হয় ইয়াসিনকে। বাকি যা থাকে তা নিয়ে বাড়ি যায় মাস চারেক পর পর। অথচ রাষ্ট্র তার প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে বিনামূল্যে।
কিন্তু লেখাপড়া তো দূরের কথা জীবনের তাগিদে ময়লার ভাগাড়ে প্লাস্টিক আর লোহা খুঁজে পাওয়াটাই বেঁচে থাকার একমাত্র হাতিয়ার মনে করে ইয়াসিন।
সমাজে এমন ইয়াসিনের গল্পের অভাব নেই। কেউ কেউ হয়তো জন্মই নেয় রাস্তার পাশে। মুখে স্পষ্ট বুলি ফোটার আগেই চকলেট আর ফুল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে যায় বিক্রির জন্য। আর একটু হাত পা শক্ত হতেই কল-কারখানায় চাকরি হয় শ্রমিক হিসেবে।

অথচ শিশুশ্রম নিরুৎসাহিত করতে আইনের অভাব নেই। ইউনিসেফের ২০২১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে ষোল কোটিরও বেশী শিশুশ্রমিক রয়েছে। শিশুশ্রমের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটা আফ্রিকায় হলেও এশিয়ার অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আড়াই কোটির বেশী। পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের শিশু বলে বিবেচনা করেছে ইউনিসেফ। এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বয়সী শিশুদের ছয় শতাংশেরও বেশি শিশু কোন না কোন শ্রমের সঙ্গে জড়িত। বলা হয় বিশ্বের ১৬ কোটি শিশু শ্রমিকের মধ্যে প্রায় আটকোটি বা অর্ধেকই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের সাথে জড়িত।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবতাটা আসলে ভিন্ন। জীবনের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার আইএলও কনভেনশনে ১৩৮ এর অনুসমর্থনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।

এই ধারা অনুযায়ী ১৪ বছরের ওপরে শিশু বিবেচিত হলেও বিশেষ বিবেচনায় তাকে শ্রমিক হিসেবে কাজ দেয়া যেতে পারে তবে অবশ্যই সে কাজ যেনো ঝুঁকিপূর্ণ না হয়। সরকারি হিসেবে নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন করতে একজন শিশু অন্তত ১৫ বছর প্রয়োজন, এর পরে প্রয়োজন হলে কাজে রাখা যেতে পারে। তবে বিশেষ বিবেচনায় ১৪ বছর বয়সীদেরকেও আনার কথা বলা হয়। এছাড়া শিশুশ্রম প্রতিরোধে নীতিমালাও রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের।
প্রতি বছরের মত এবারও ১২ জুন পালিত হচ্ছে শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করি, শিশুশ্রম বন্ধ করি’।
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, শিশুশ্রম নিরসনে শ্রম মন্ত্রণালয়সহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অধিদপ্তর, সংস্থার কর্মকর্তাদের আরও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

শিল্প মালিকদের কলকারখানায় শিশুদের নিয়োগ না দিতে এবং সমাজের সব পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বেসরকারি সংস্থাকে আরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকার সকল প্রকার শিশুশ্রম নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যে বয়সটা নির্বিঘ্নে চলার, যে বয়সটা পাঠ্যবই হাতে নিয়ে স্কুলে যাবার কিংবা যে বয়সটায় পুষ্টিকর খাবার সবচেয়ে বেশি সেই বয়সটাতেই শিশু শ্রমিকেরা পিষ্ট হচ্ছে জীবনের চাকায়। পান্তা-নুনের হিসেব কষতে কষতে শিক্ষার সনদ কিংবা বিনোদনের সুযোগ একেবারেই অধরা রয়ে যাচ্ছে তাদের। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেবারে পরিবার থেকেই শিশুশ্রম প্রতিরোধী মনোভাব গড়ে তুলতে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম।
একাত্তর/এসজে
