সাম্প্রতিককালে প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির পেশাদার প্রতারক চক্র। অতি সম্প্রতি মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ও ই-কমার্স ব্যবসার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে দেশ জুড়ে সমালোচিত হয়েছে ই-কমার্স নামক ব্যবসা।
এমএলএম ও ই কমার্স ব্যবসা নিয়ে যখন সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক চলছে, সাধারণ মানুষ যখন অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে পরে অসহায় ও বিব্রত ঠিক এই মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২১ সেপ্টেম্বর) র্যাব-৪ এর একটি চৌকস দল মহানগরীর পল্টন থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে সুইসড্রাম কোম্পানির অন্যতম পরিচালক কাজী আল-আমিনসহ (৩৪) মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এছাড়া অভিযানকালে প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিলো, দুইটি ল্যাপটপ, একটি প্রজেক্টর, কোম্পানির ব্যবহৃত দুইটি সিল, কোম্পানির ব্যানার দুইটি, বিভিন্ন ধরনের চারটি ডায়েরি ও খাতা, একটি রেজিস্টার, কোম্পানির ১২৫টি লিফলেট, প্রতারণায় ব্যবহৃত সুইসড্রাম কোম্পানির ভুয়া ঔষধ/প্রসাধনী সামগ্রী, সুইসড্রাম কোম্পানির ২৫ সেট ডিস্ট্রিবিউটর ওয়ার্কিং ফাইল, ২৩টি মোবাইল ফোন এবং নগদ এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৫ টাকা।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, কাজী আলামিন (৩৪), মুন্সিগঞ্জ। মোঃ সালাউদ্দিন (৪৬), ব্রাহ্মণবাড়িয়া। শেখ মোঃ আব্দুল্লাহ (৫৯), ময়মনসিংহ। মনিরা ইয়াসমিন (৪৩), নারায়ণগঞ্জ। জাহিদ হাসান (৪২), নারায়ণগঞ্জ। মোঃ স্বপন মিয়া (৩৮), মাদারীপুর। মোঃ শাহজাহান (২৫), কুমিল্লা। মোঃ মিজানুর রহমান (৫০), টাঙ্গাইল। মোঃ বাদশা। সুলাইমান (২৬), মাদারীপুর। ইমাম হোসাইন (৩৫), বরিশাল। আব্দুর রাজ্জাক। আনারুল ইসলাম (৪২), পটুয়াখালী। মিজানুর রহমান (৩৯), চাঁদপুর। মোঃ ফারুক উদ্দিন (৪৭), নোয়াখালী। আঞ্জমান আরা বেগম (৫২), ঢাকা। শেখ রবিন (৩৩), ঢাকা। ইমাম হোসাইন (৩৫), বরিশাল। মোছা. আছমা বেগম (৩৫), পাবনা।
প্রতারক সংগঠনের কার্যপদ্ধতি টার্গেট/ভিকটিম/সদস্য সংগ্রহ
টার্গেট বা সদস্য সংগ্রহ: প্রতারক চক্রের প্রতিটি সদস্য প্রতারণাকে তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করায় তাদের একটি সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে। এই প্রতারক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী/সদস্য রয়েছে। এরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেকার ও অসচ্ছল যুবক-যুবতী এমনকি শিক্ষিত লোকজনকে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে প্লাটিনাম, গোল্ড, সিলভার ও সাধারণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। নিয়মিত গমনা গমনকারী এবং কথাবার্তায় পটু, আর্থিকভাবে মোটামুটি সচ্ছলদেরকে সদস্য সংগ্রহের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তাদেরকে মোটা অংকের টাকা প্রদানে বাধ্য করে এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

ভুয়া পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় প্রদান: গ্রেপ্তারকৃত কাজী আল-আমিন (৩৪) দামি ব্রান্ডের গাড়ি নিয়ে কোম্পানির নতুন সদস্যদের নিকট প্রবাসী এবং বিভিন্ন দপ্তরের পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতো। তাদেরকে প্রলুব্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে মনোনয়ন প্রদান করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতো। ভিকটিমদের প্রলুব্ধ করে এবং তথ্যাদি সংগ্রহ করে ভুলিয়ে নানান কৌশলে প্রতারক চক্রের অফিস কার্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হতো। এদেরকে প্রতি গ্রাহক/টার্গেট সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হতো এবং অধিক মুনাফা লাভের স্বপ্ন দেখানো হতো।
প্রতারণার কৌশল: ধৃত প্রতারক চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জৌলুসপূর্ণ ও আকর্ষণীয় রেস্টুরেন্টে ভিকটিমদেরকে নিয়ে এসে প্রতারণামূলক সভা/সেমিনার/মোটিভেশনাল ওয়ার্কশপ/আকর্ষণীয় লাঞ্চ ও ডিনার পার্টির আয়োজন করতো। অসহায়, নিরীহ অর্ধ-শিক্ষিত এমনকি শিক্ষিত শ্রেণির ভিকটিমরা এধরনের ঝাঁক-জমকপূর্ণ আয়োজনে প্রলুব্ধ হয়ে খুব সহজেই তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিতো।
আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, সুইসড্রাম কোম্পানি মধ্য-শিক্ষিত বেকার ও নিরীহ যুবক এবং শিক্ষিত সরল শ্রেণির লোকজনদের মোটিভেশনাল বক্তব্য প্রদান ও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সদস্য হিসেবে সুইসড্রাম অ্যাপস -এ অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
প্রতারণার কৌশল হিসেবে তারা ঘন ঘন তাদের অফিস পরিবর্তন করতো। প্রতারক চক্রটি সুইসড্রাম কোম্পানির নামে নামে একটি ঔষধ (সর্ব রোগের মহৌষধ) যা ক্যান্সার, ডায়বেটিস ও হার্টের ঔষধ বলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলো। এমনকি উক্ত ঔষধ করোনা প্রটেক্ট্রিভ হিসেবে কাজ করে বলেও প্রচার করে এই কোম্পানি।

আরও পড়ুন: বাড়িওয়ালাকে পানি-বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ভাড়াটিয়া!
সুইসড্রাম কোম্পানিতে নতুন সদস্যদের পাঁচটি ক্যাটাগরির মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। ১ ও ২ ক্যাটাগরি ক্যাটাগরিতে ৪ হাজার ২০০ থেকে ছয় হাজার ২০০ টাকার বিনিময়ে এক প্যাকেট ঔষধ এবং ৩, ৪ নং ক্যাটাগরিতে ২৬ হাজার ২০০ থেকে ৫৮ হাজার টাকার বিনিময়ে ৬-১৪ প্যাকেট ঔষধ এবং ৫নং ক্যাটাগরিতে এক লাখ ১৭ হাজার টাকার বিনিময়ে ২৮ প্যাকেট ভুয়া ঔষধ প্রদান করে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণা করে আসছে। উল্লেখ্য যে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্দিষ্ট কোন সাইনবোর্ড ও ঠিকানা ব্যবহার করতো না।
একাত্তর/আরএ
