যে মাঠটিতে তিনি গড়ে উঠেছেন, বেড়ে উঠেছেন, ফুটবলের আনন্দ উপভোগ করেছেন, ফাইনালে হেরে অঝোরে কেঁদেছেন এবং একের পর এক ঐতিহাসিক ট্রফি জয়ের উল্লাসে ভেসেছেন, সোমবার সেই চেনা ঘাসের ওপরই শেষবারের মতো হাঁটল তাঁর দুই পা।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন এক মুহূর্ত আসতে চলেছে, যা কেবল তাঁর নিজের ক্যারিয়ারেই নয়, বরং পুরো ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসেই এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দেবে। কারণ, আর্জেন্টিনার জাতীয় দল ছাড়া লিওনেল মেসি আর আগের মতো থাকবেন না, আর লিওনেল মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিও আর কখনো আগের মতো থাকবে না।

৫ অক্টোবর, ২০২৬- যে ট্রেনিং সেন্টারের বুকে কাতার বিশ্বকাপের তৃতীয় তারকা যুক্ত হওয়ার পর নাম রাখা হয়েছিল ‘লিওনেল আন্দ্রেস মেসি’, সেই কমপ্লেক্সের মূল মাঠে শেষবারের মতো হেঁটেছেন বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। আগের শত শত দিনের মতোই পায়ে ফুটবল আর চারপাশে দীর্ঘদিনের সতীর্থরা। কিন্তু আজকের দিনটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা; মেসি জানতেন, এটিই তাঁর শেষবার।
এই অনুশীলনের পর আর কোনো দ্বিতীয় প্রস্তুতি থাকবে না। এস্তাদিও মনুমেন্তালে আফ্রিকার দেশ বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের পর আর কোনো জাতীয় দলের ক্যাম্প থাকবে না, থাকবে না কোনো বিমান যাত্রা, বাজবে না জাতীয় সঙ্গীত, আর দেশের জার্সিতে কোনো রাত জাগা যুদ্ধও হবে না।

মাঠের বাইরে থেকে একশরও বেশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা তাক করা ছিল তাঁর দিকে। ক্যারিয়ারজুড়ে হাজারও ক্যামেরা যেভাবে তাঁকে অনুসরণ করেছে, আজও তাই হচ্ছিল। কিন্তু আজকের দৃশ্যপট ছিল একদম ভিন্ন, ক্যামেরাগুলো সাধারণ কোনো অনুশীলনের ছবি তুলছিল না, তারা ধারণ করছিল আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির জীবনের শেষ প্রশিক্ষণ পর্বের প্রতিটি আবেগঘন মুহূর্ত।
বিকেল সাড়ে ৫টায় শুরু হয় এই ঐতিহাসিক শেষ অনুশীলন। প্রথমে জিম সেশন এবং পরবর্তীতে মাঠে নামেন ফুটবলাররা। ট্রেনার লুইস মার্তিনের ওয়ার্ম-আপের পর পুরো অনুশীলনের নিয়ন্ত্রণ নেন মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। আর সেখানে পুরো বিকেলজুড়ে ফুটে ওঠে সেই চিরচেনা রূপকথা, পায়ে বল নিয়ে জাদুকর মেসি, আর তাঁকে ঘিরে সেই সতীর্থরা, যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালী অধ্যায়।

কুটি রোমেরো, হুলিয়ান আলভারেস, নিকোলাস ওটামেন্ডি, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, রদ্রিগো ডি পল এবং জিওভানি লো সেলসোদের সাথে বল ট্র্যাকিং, মজার খেলা, হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে মেতে ওঠেন মেসি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল এটি আর ১০টা সাধারণ অনুশীলনের মতোই এক বিকেল। কিন্তু সবার মনই বলছিল, প্রতিটি পাস, প্রতিটি হাসি আর আড্ডার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অশ্রুসজল বিদায়গাঁথা, যা আগেই লেখা হয়ে গেছে।
দলের এই অনুশীলনের ফাঁকে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই বিশেষ অতিথি, ইন্টার মিয়ামিতে মেসির বর্তমান কোচ কিলি গঞ্জালেস এবং জাতীয় দলের সাবেক সতীর্থ পোচো লাভেজ্জি। যারা মেসির সাথে ড্রেসিংরুম, ভ্রমণ, পরাজয়ের কষ্ট আর বিজয়ের অনাবিল আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন, তারা আজ কোচ বা খেলোয়াড় হিসেবে আসেননি; এসেছিলেন বন্ধু ও ভাই হিসেবে এই ঐতিহাসিক ক্ষণে অধিনায়কের পাশে দাঁড়াতে।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিকেলটি হয়তো আর আট-পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই মনে হতে পারত, মেসির পায়ে বল, সতীর্থদের অট্টহাসি আর নির্দেশনায় স্কালোনি। কিন্তু ভেতরের অনুভূতি সবকিছু বদলে দিয়েছিল। প্রতিটি পাসের আলাদা অর্থ ছিল, প্রতিটি ক্লিক হয়ে উঠছিল ইতিহাসের অমূল্য ফ্রেম।
আর ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি টিক-টিক শব্দ ফুটবল বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেই পরম সত্যের দিকে, যা এতদিন কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের নীল-সাদা জার্সিতে মহাতারকা লিওনেল মেসির রূপকথার রাজকীয় ইতি!
তথ্যসূত্র: ওলে
