ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠবে, প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের (পিএসজি) রাজকীয় ডিফেন্স নাকি আর্সেনালের ঐতিহাসিক স্বপ্নপূরণ? শনিবার হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় বাংলাদেশ সময় রাত দশটায় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের হাইভোল্টেজ ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি।
একদিকে লুইস এনরিকের পিএসজি চাইছে রিয়াল মাদ্রিদের পর আধুনিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দু’বার ট্রফি জিতে নিজেদের এক নতুন সাম্রাজ্য তৈরি করতে। অন্যদিকে, গানার্সদের লক্ষ্য কাতারে কাতার টাকা ঢালা পিএসজিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরোপের সিংহাসন দখল করা।

ফুটবল পণ্ডিতদের চোখে লুইস এনরিকের ফরাসি চ্যাম্পিয়নরাই ট্রফি ধরে রাখার দৌড়ে ফেভারিট। অথচ এক সময় লিওনেল মেসি, নেইমার এবং কিলিয়ান এমবাপের মতো মেগাস্টারদের নিয়ে গড়া পিএসজি যা পারেনি, তা-ই করে দেখিয়েছেন এনরিক। ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই স্প্যানিশ কোচ তথাকথিত ‘সুপারস্টার যুগ’-এর অবসান ঘটিয়ে নিজের মতো করে এক কঠোর পরিশ্রমী ও দুর্দান্ত দল গড়ে তোলেন।
প্রথম মৌসুমে সেমিফাইনাল এবং গত বছর এই আর্সেনালকেই সেমিফাইনালে গুঁড়িয়ে দিয়ে ইন্টার মিলানকে হারিয়ে পিএসজিকে তাদের ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি এনে দেন তিনি। কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টস ক্লাবটি কিনে নেয়ার ১৪ বছর এবং ১২০ কোটি ইউরোরও বেশি খরচ করার পর অবশেষে ধরা দিয়েছিল সেই আরাধ্য ইউরোপীয় কাপ।

পিএসজি বা ঘরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটির মতো আকাশছোঁয়া আর্থিক পেশিশক্তি আর্সেনালের নেই। কিন্তু কোচ মিকেল আর্তেতা দীর্ঘ সাত বছর ধরে এই দলটিকে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে, পরম যত্নে গড়ে তুলেছেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘স্লো-কুকড’ টিম। গত গ্রীষ্মে গানার্সরা বুঝতে পারে যে তাদের তরুণ দলটি এবার বড় সাফল্যের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ পজিশনগুলোতে নতুন শক্তি যোগ করে।
যার ফলস্বরূপ, দীর্ঘ ২২ বছর পর আর্সেনাল ঘরে তুলেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অধরা শিরোপা। ২০০৬ সালে প্যারিসের ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গের দুই দশক পর এবার ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে গানার্সদের।
ফাইনালে দুই দলের খেলার শৈলী ও খ্যাতি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, যা এই ম্যাচকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চলতি টুর্নামেন্টে ৪৪ গোল করে পিএসজি যেখানে সর্বোচ্চ গোলদাতা, সেখানে আর্সেনাল পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে কম, মাত্র ৬টি গোল হজম করে এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে। ব্যালন ডি’অর বিজয়ী উসমান দেম্বেলে (যিনি কাফের চোট কাটিয়ে ফিট হয়ে উঠছেন), খিচা কভারাতসখেলিয়া এবং দেজিরে দুয়েদের নিয়ে গড়া পিএসজির আক্রমণভাগ সেমিফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখকে ৬-৫ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে ফাইনালে এসেছে।

অন্যদিকে, বুকায়ো সাকার চতুর উইং-প্লে বাদ দিলে আর্সেনালের মূল শক্তি হলো তাদের ইস্পাতকঠিন রক্ষণ ও লড়াকু মানসিকতা। গ্যাব্রিয়েল এবং সালিবার সেন্টার-ব্যাক জুটি এবং মাঝমাঠের পাওয়ারহাউজ ডেক্লান রাইস এবার গানার্সদের প্রধান ভরসা। আর্তেতার দল এবার ‘আন্ডারডগ’ বা ফেভারিট না থাকার তকমা গায়ে মেখেই মাঠে নামবে এবং সেট-পিস বা কর্নার-ফ্রিকিকের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পিএসজিকে বোকা বানাতে চাইবে।
ফাইনালে দুই দলের শারীরিক কন্ডিশনে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ঘরোয়া লিগের ধকল। পিএসজি সাধারণত কম ম্যাচ খেলে এবং এনরিক তাঁর প্রধান তারকাদের লিগের ম্যাচে বেঞ্চে বসিয়ে নিয়মিত বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি লঁস ও নান্তেসের বিরুদ্ধে পিএসজির ম্যাচগুলো ফরাসি লিগ কর্তৃপক্ষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সুবিধার্থে পিছিয়ে দিয়েছিল। বিপরীতে, আর্সেনালকে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে ম্যান সিটিকে টপকে প্রিমিয়ার লিগের ট্রফি জিততে হয়েছে, যার ফলে সাকা-রাইসদের ওপর শারীরিক ধকল অনেক বেশি।

আর্সেনালের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি সিবিএস স্পোর্টসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয়ের সুর টেনে বলেন, আমাদের দল এখনো পিএসজির স্তরে পৌঁছায়নি, তাই আমাদের বিনয়ী হতে হবে। পিএসজি জানে কীভাবে ট্রফি জিততে হয়। অঁরি নিজে ২০০৬ সালে আর্সেনালের হয়ে ফাইনাল হেরে যান, পরে ২০০৯ সালে বার্সার হয়ে চ্যাম্পিয়ন হন।
তবে টানা তিনবার রানার্স-আপ হওয়ার পর এবার প্রিমিয়ার লিগ জয় আর্সেনালকে নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। লিগ উদযাপনের সময় আর্সেনালের তরুণ তুর্কি মাইলস লুইস-স্কেলি শ্যাম্পেইনের বোতল উঁচিয়ে সমালোচকদের ধুয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ওরা আমাদের বলেছিল আমরা নাকি ট্রফি দেখলেই হাত কাঁপাই, আর এখন দেখ, বোতলটা আমাদের হাতেই। গানার্স ভক্তরা আশা করছেন, শনিবারের বুদাপেস্টের রাতটি হবে আরও বড় শ্যাম্পেইনের বোতল খোলার রাত।
