বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র কোনটি? এমন প্রশ্নের উত্তরে নানা ঘটনায় নানা সময়ে একটি অস্ত্রের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, আর সেটি হলো একে-৪৭। কেন এটিকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বলা হচ্ছে? সমর বিশারদরা বলছেন, কল্পনার তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী এই অস্ত্র।
বড় বড় কামান, বিমান হামলা এবং রকেটে সমন্বিত আক্রমণের তুলনায় এই রাইফেলের গুলিতে বিশ্বে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছর কালাশনিকভের বুলেটের আঘাতে আড়াই লাখ মানুষের প্রাণ যায়। এখন পর্যন্ত বিশ্বে বর্তমানে ১০ কোটির বেশি কালাশনিকভ রাইফেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

এই দুনিয়াতে হাতে ব্যবহার করা যেসব অস্ত্র, তাদের মধ্যে সবচেয়ে, সেরা অস্ত্র একে-৪৭। বিশ্বজুড়ে ১০৬টি দেশের সামরিক এবং বিশেষ বাহিনী এখনো একে-৪৭ ব্যবহার করে। এটি এমন একটি অস্ত্র, যা সম্পূর্ণরূপে পানিতে নিমজ্জিত এবং আগুনের মধ্যও শত্রুপক্ষের ওপর হামলা চালানো যায়।
শুধু সামরিক ও বিশেষ বাহিনীই নয়, বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠী, মাদক বাহিনী, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন থেকে শুরু করে ছোট খাটো বহু গোষ্ঠীর কাছে এই একে-৪৭ একটি স্বপ্নের মতো। ২০০৪ সালে বিশ্বকে বদলে দেয়া ৫০টি পণ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলো একে-৪৭।
কালশনিকভ রাইফেল হিসাবে পরিচিত এই অগ্নেয়াস্ত্র থেকে সেকেন্ডে ৮১৫ মিটার গতিতে বুলেট ছুঁটে যায়। ভয়ংকর এই গতিবেগ আর ভারি বুলেটটি আট ইঞ্চি কাঠ এবং পাঁচ ইঞ্চি কনক্রিট ভেদ করতে পারে। এছাড়া এতে কষ্টমাইজ বুলেট ব্যবহার করা যায়। এতে সিঙ্গেল শট, ব্রাশফায়ার এবং গ্রেনেড ছোড়ার সুবিধা আছে ।

নির্ভরতার দিক দিয়ে আজও একে-৪৭ অনন্য। এটি কখনো ব্যাক ফায়ার হয় না। দুনিয়ার যে কোন স্থানে খুব সহজেই ব্যবহার করা যায়। তীব্র শীত, গরম, ভেজা আবহওয়াতে এর এর কিছু হয় না। অন্যান্য রাইফেলের তুলনায় একে-৪৭ জ্যাম হবার হারও কম। এতো সব বৈশিষ্ট্যের কারণেই একে-৩৭ সারা বিশ্বে জনপ্রিয়।
বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ এর নকশা করেছিলেন মিখাইল কালাশনিকভ। তার নামেই এটি নামকরণ করা হয়। সেনাবাহিনীতে তরুণ উদ্ভাবকের স্বীকৃতিও পাওয়ার পর ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধে আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি অটোমেটিক রাইফেল একে-৪৭-এর নকশা করেছিলেন।

তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করতে, যেটি সব পরিস্থিতিতে টেকসই হবে, এবং আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে হবে বিধ্বংসী। সাত বছরের পরিশ্রমের ফসল একে-৪৭। কালাশনিকভের সেই নকশা করা আগ্নেয়াস্ত্র গত অর্ধশতাব্দীতে বিশ্বে সমাদৃত। তার নামেই এটির নামকরণ হয়েছিল।
একে-৪৭-এর মতো ভয়ংকর অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে দেখে দুঃখ পেয়েছিলেন তিনি। সেই দুঃখে ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৯৪ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কালাশনিকভ অ্যাসল্ট রাইফেলের উদ্ভাবক মিখাইল কালাশনিকভ। তবে মৃত্যুর পরও অমর তিনি। প্রতিদিনই কোন না কোনভাবে উচ্চারিত হয় এই নাম।

এর নকশাও খুবই সাদামাটা আর তৈরি করতে খরচও খুব কম। অস্ত্রটির রক্ষণাবেক্ষণও সহজ। মাত্র আটটি অংশ দিয়ে তৈরি একে-৪৭। এটি ব্যবহার এতই সহজ যে বলা হয়, শিশুকে চালনা শেখানো সম্ভব এবং সেটা নাকি মাত্র এক ঘণ্টার মধ্য। এ কারণেই দেখার পরেই চালানো শেখার দিক দিয়ে এগিয়ে কালাশনিকভ।
আর তাই বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে অনুলিপি করা যায় এমন রাইফেল একে-৪৭। রাইফেলটিতে মাত্র আটটি নড়াচড়া করানো সম্ভব এমন অংশ রয়েছে। এই রাইফেলটির অংশগুলো খুলে মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই তা আবারও জোড়া লাগানো সম্ভব। অস্ত্রটি বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশেও ব্যবহার করা যায়।

প্রতি সেকেন্ডে ছয়শ’ গুলি ছুঁড়তে সক্ষম এই রাইফেলটি ১৯৪৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির কয়েকটি নির্দিষ্ট ইউনিটে এই রাইফেলের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে এর কার্যকারিতায় মুগ্ধ হয়ে সোভিয়েট সেনাবাহিনীতে পূর্ণমাত্রায় চালু করা হয়। দুই বছরের জনপ্রিয় হয়ে উঠে একে-৪৭।
সে সময় থেকে এ রাইফেল সোভিয়েট ইউনিয়নের একটি অন্যতম রপ্তানি সামগ্রীতে পরিণত হয়। একে-৪৭ রাইফেল অত্যন্ত কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য হওয়ায় ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এম-১৬ রাইফেল ফেলে দিয়ে এই অস্ত্র গ্রহণ করে। ক্রমেই পশ্চিমা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এর জনপ্রিয়তা।

রাশিয়া ছাড়া আরও কয়েকটি দেশ কালাশনিকভ রাইফেল তৈরি করে সরবরাহ করে থাকে। চীন, ইসরায়েল, ভারত, মিসর, নাইজেরিয়াসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের একে-৪৭ তৈরির লাইসেন্স আছে। মোজাম্বিকের জাতীয় পতাকায় রয়েছে একে-৪৭-এর ছবি। আরও কিছু দেশের পতাকাতেও রয়েছে এই স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রটি।
একে-৪৭ রাইফেলটিতে মাত্র আটটি নড়াচড়া করানো সম্ভব এমন অংশ রয়েছে। এই রাইফেলটির অংশগুলো খুলে মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই তা আবারও জোড়া লাগানো সম্ভব। কে-৪৭ নিয়ে বিখ্যাত হয়েছে অনেক গান। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন র্যাপ গায়ক লিল ওয়েনের একে-৪৭।

ধ্রুপদি নকশার জন্য লন্ডনের ডিজাইন মিউজিয়াম ২০১১ সালে যেসব পণ্য নির্বাচন করেছিল তার একটি ছিল একে-৪৭। বিশ্বে বর্তমানে ১০ কোটিরও বেশি কালাশনিকভ রাইফেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যে বিখ্যাত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ভাবনে কালাশনিকভ বিখ্যাত হয়েছিলেন তা থেকে এক পয়সাও রোজগার হয়নি তার।
