গাজা উপত্যকায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকেই লোহিত সাগরে রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী- হুতি। গেলো নভেম্বরেই ইসরাইলি ব্যবসায়ীর পূঁজি নিয়ে চলা একটি জাপানের পরিচালিত জাহাজকে হলিউড সিনেমাকে হার মানানো দুঃসাহসিক এক অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের ভিডিও ভাইরাল হলে, হুতিদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে বিশ্ব।
হুতিদের তরফে প্রকাশ করা সেই ভিডিও প্রমাণ করে গেরিলা কায়দায় যে কোন কোন জাহাজকে মুহূর্তের মধ্যেই কব্জায় নিতে পারে তারা। তাদের রয়েছে হাজার হাজার সুপ্রশিক্ষিত ও সাহসী যোদ্ধা, যাদের নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কে থাকে পশ্চিমার। হুতিদের একটাই কথা, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ না হলে, লোহিত সাগরেও কোন বাণিজ্যিক জাহাজকে শান্তিকে চলাচল করতে দেয়া হবে না, দেয়া হবে বাধা।
ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পাশাপাশি হুতিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। সম্প্রতি লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালীতে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা করেছে এবং হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সবশেষে, সোমবারই এক রাসায়নিক বা তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন ও জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়েছে তারা।

লোহিত সাগরে হুতিদের এমন যুদ্ধাংদেহী মনোভাবে বেকায়দায় পড়েছে ইসরাইলসহ তাদের মিত্র আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ। সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্য লাটে উঠতে বসেছে। হুতিরা হুমকি হয়ে উঠায় এরিমধ্যে লোহিত সাগরে এড়িয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ কোম্পানিগুলো। বিকল্প পথে চলাচলের জন্য এখন অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হবে সব দেশকে । এতে করে অস্থির হবে পণ্য ও জ্বালানির বাজার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে, এবার তাই একাধিক দেশ যৌথভাবে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্ত ও এডেন উপসাগরে টহলদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘অপারেশন প্রস্প্যারিটি গার্ডিয়ান’ নামের বহুদেশীয় নিরাপত্তা উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বাহরাইন, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সেশেলস ও স্পেন যোগ দিচ্ছে। তবে এই জোটের কর্মপন্থা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর মাঝেই হুতিরা সোজা ভাষায় বলে দিয়েছে, আমেরিকার নেতৃত্বে দশটি দেশ জোট করলেও, তাদের কিছু আসে যায় না। লোহিত সাগরে তাদের মাস্তানি চলবেই। ইসরাইলগামী কোন জাহাজকে তারা লোহিত সাগরে চলাচল করতে দেবে না। শুধু ইসরাইলগামী নয়, দেশটির সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজে তাদের হামলাও বন্ধ হবে না। মঙ্গলবার মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে একথা জানান হুতির এক মুখপাত্র।

হুতি গোষ্ঠির সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মেদ আল-বুখাতি বলেন, আমেরিকার যদি গোটা বিশ্বকেও এক করে, তারপরও আমাদের সামরিক অভিযান বন্ধ হবে না। এজন্য যে কোন ক্ষতি মেনে নিতে প্রস্তুত আমরা। শুধু ইসরাইল গাজায় হামলা ও গণহত্যা বন্ধের পাশাপাশি সেখানে ত্রাণ পৌঁছাতে দেয়ার ব্যবস্থা না করা হলেই কেবল আমরা রোগিত সাগরে হামলা বন্ধ করবো, তার আগে নয়।
ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে ইসরাইলের দিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপরেও হুতি গোষ্ঠী হামলা চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত ডজনখানেকের বেশি জাহাজকে হামলা চালিয়েছে তার। এসব হামলাকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসাবে উল্লেখ করেছে আমেরিকা।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের এমন কথার প্রতিক্রিয়া হুতির শীর্ষ সামরিক কর্তা মেজর জেনারেল ইউসুফ আল-মাদানি বলেন, গাজায় যে কোন আগ্রাসন মানেই লোহিত সাগরে আগ্রাসন। ফিলিস্তিন ও আমাদের বিরুদ্ধে যে কোন দেশ বা দলই লাগতে আসুক না কেন, আমরা সেটির মুখোমুখি হবো। তিনি আরও জানান, মার্কিন নেতৃ্ত্বে নতুন জোটকেও মোকাবেলা করবেন তারা।

ইয়েমেনে বিশাল এক সামরিক সম্ভার রয়েছে। যার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে হুতিরা। রাজধানী সানাও তাদের শাসনেই চলে। শুরু থেকেই তারা সতর্ক করে দিয়েছিল যে, তারা বাব আল-মানদেব প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে থাকবে। আর গাজার ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রক্ষার জন্যই তারা এমনটি করে যাবে বলে জানিয়ে আসছে হুতিরা।
হুতির শীর্ষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল সালাম কড়া হুশিয়ারী দিয়ে বলেছে, তাদের আক্রমণগুলো অবাধ্যতার কাজ নয়। তাই, নতুন জোট যদি আক্রমণ শুরু করার বিষয়ে অনড় থাকে, তাহলে তাদেরও পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই অঞ্চলে বিস্তৃত সংঘাতের সৃষ্টি করবে, সীমান্তে সীমান্তে অশান্তি ছড়াবে। পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে হুতিরা তাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর।
এক হুতিকে রুখতে একট্টা ১০ দেশ!