হামাস ও ইসরাইলের যুদ্ধের ঢেউ পৌঁছেছে লোহিত সাগরে। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন জানাতেই লোহিত সাগরে হামলা শুরু করেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এখন তাদের হামলার জবাব দিতে এখন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কারা ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ইসরাইল-হামাস যুদ্ধে তাদের স্বার্থটাই বা কী?
হুথি আন্দোলন বা হুসি আন্দোলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর সমর্থক। একটি শিয়া ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন, যা নব্বই দশকে ইয়েমেনে জন্ম নেয়। এটি প্রধানত জাইদি শিয়াদের নিয়ে গঠিত, সংগঠনটির নাম মূলত নেতৃত্বদানকারী হুথি গোত্রদের থেকে এসেছে।
হুথিদের নেতা হুসেইন আল-হুথি শিয়া ইসলামের জাইদি ধারার অনুসরণে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন শুরু করেন। জাইদিরা কয়েক শতাব্দী ধরে ইয়েমেন শাসন করলেও ১৯৬২ সালে গৃহযুদ্ধের পর সুন্নিরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।

এরপর তারা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সুন্নি মৌলবাদ মোকাবিলা বিশেষ করে সৌদি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া ওয়াহাবি মতবাদ মোকাবিলায় আল-হুতি আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনই ক্রমে সশস্ত্র রূপ নেয়। ২০০৩ সালে ইয়েমেন ইরাকে মার্কিন হামলাকে সমর্থন দিলে সুযোগটি কাজে লাগায় হুথিরা।
জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনে হুথিরা। যার প্রতিক্রিয়ায় সালেহ সরকার প্রথমে হুসেইন আল-হুথির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-হুথিকে হত্যা করে ইয়েমেনি সেনারা । কিন্তু এরপরও আন্দোলনটির মৃত্যু হয়নি।
হুথিদের সামরিক শাখায় দলে দলে যোগদান করে ইয়েমেনি তরুণরা। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে ‘আরব বসন্ত’ ঝড় শুরু হয় তা নাড়িয়ে দেয় ইয়েমেনকেও। হুথিরা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সাআদা দখলে নিয়ে সালেহ'র শাসনের অবসানে লড়াই শুরু করে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা’র বিভিন্ন অংশ দখলে নেয় হুথি গোষ্ঠী। পরের বছরের শুরুতে তারা রাষ্ট্রপতির বাসভবনও দখল করে। পর্যায় ক্রমে দেশটির বেশিরভাগ অংশ এবং সৌদি আরবের কাছাকাছি অবস্থিত পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
২০১৪ সালে ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে এই গোষ্ঠী একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। এরপর গোষ্ঠীটি ইরানের সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন এক সামরিক জোটের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে কয়েক বছর ধরে লড়াই চালায়। যদিও এই সময়ে উভয়পক্ষই শান্তি আলোচনার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিয়া এই গোষ্ঠীটিকে ইরানের প্রতিরূপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ তাদের নিজস্ব ভিত্তি ও স্বার্থ আছে। দেশটির নির্বাসিত প্রেসিডেন্ট আব্দে-রাব্বু মানসুর হাদির কাছ থেকে ২০২২ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন রাশাদ আল-আলিমি। হাদি এবং হুথিদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো বেশ খারাপ।

সম্প্রতি আবারো আলোচনায় হুথিরা। কারণ গাজায় হামলার জবাবে লোহিত সাগরে ইসরাইলের সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছে তারা। তাদের দাবি, গাজায় সহিংসতা কামাতে তেল আবিবকে চাপ দেয়াই তাদের হামলার উদ্দেশ্য। গত ১৯ নভেম্বর অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে হেলিকপ্টার নিয়ে একটি ইসরাইলি জাহাজ আটক করে ইয়েমেনে নিয়ে যায় গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা।
এরপর গত দুই মাস ধরে তারা লোহিত সাগরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে জাহাজগুলো নিজেদের রুট পরিবর্তন করে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই হামলা বন্ধে লোহিত সাগরে একটি সামরিক জোট গঠন করে যুক্তরাষ্ট্র। হামলা চালায় ইয়েমেনে।
তবে মার্কিন জোটের এমন বড় হামলা ও হুঁশিয়ারিতেও দমে যায়নি হুতিরা। তারা জানিয়েছে, মার্কিনরা হামলা চালিয়ে গেলেও তারা লোহিত সাগরে ইসরাইলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখবে। হুথিরা ইসরায়েলকে গাজায় মানবিক সহায়তা বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব হামলা অন্যান্য দিক থেকে হুথিদেরই উপকার করছে। কারণ, এই গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। আর এসব হামলা তাদের নিয়ে অন্যান্য দেশ ও সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে। এরই মধ্যে মার্কিন জোটের হামলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল দিয়ে হয়ে থাকে। হুথিরা আক্রমণ শুরু করার পর থেকে বেশ কয়েকটি শিপিং কোম্পানি এই পথ দিয়ে তাদের জাহাজ না চালানোর কথা জানিয়েছে। আর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে।
১০০ দিনে এক হাজার সামরিক যান ধ্বংস করেছি: হামাস