ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধের মধ্যেই গোটা বিশ্বের নজরে এখন ইরাক-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এরইমধ্যে প্রতিক্রিয়া জানানোর পাশাপাশি তেহরান ও ইসলামাবাদকে শান্ত থাকার আহবান জানিয়েছে। তারপরও এই উত্তেজনা নিয়ে এখনো সংশয় আর শঙ্কায় আছে বিশ্ব।
পাল্টাপাল্টি হামলায় ঘটনায় সংঘাতময় পৃথিবীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যোগ হয়েছে নতুন উত্তেজনা, যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ঘটনা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে কী-না, এমন আলোচনা শুরু হয়েছে দেশে দেশে। মানুষজন জানার চেষ্টা করছে, কেন ইরান-পাকিস্তানের মধ্যে এই বিরোধ।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক কিছু বিরোধ রয়েছে। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে ধর্ম। ইরান মূলত একটি শিয়াপন্থী রাষ্ট্র। অন্যদিকে পাকিস্তান হচ্ছে সুন্নি মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ। বিভিন্ন সময় শিয়া-সুন্নির উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে নানা হত্যাকাণ্ডও হয়েছে। এনিয়ে অস্বস্তি আছে দুই দেশের মধ্যেই।
শিয়া-সুন্নির বিরোধের পেছনে সীমান্তের জঙ্গি গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে মনে করে তেহরান ও ইসলামাবাদ। সিস্তান-বেলুচিস্তান ইরানের একটি প্রদেশ। এর ঠিক পাশেই রয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ। এই সীমান্তেই সক্রিয় আছে জইশ আল-আদলের মতো জঙ্গি গোষ্ঠী।
তেহরান মনে করে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান থেকে জঙ্গিরা এসে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে হামলা করছে। অন্য দিকে পাকিস্তানও মনে করে, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন যোগাচ্ছে ইরানের গোয়েন্দারা। পাকিস্তান অংশে বালুচরা আলাদা একটি দেশ গঠন করতে চায়।
পাকিস্তান ও ইরান- দুদেশের সীমান্তের ভেতরে 'জঙ্গিদের কার্যক্রম' নিয়ে দুই দেশের অস্বস্তি চরমে পৌঁছার কারণেই পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে বলে মনে করতে চাইছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই মুহূর্তে ইরানের কাছে পাকিস্তান নয়, পশ্চিমা শক্তি আর ইসরাইলই হচ্ছে তাদের প্রধান শক্র।
তারা বলছেন, ইরান-পাকিস্তান বিরোধ যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে যাবে না, কারণ এই দুই দেশকে ঘিরেই বিশ্ব মোড়লদের রয়েছে নিজ নিজ স্বার্থ। যুদ্ধ বাঁধলে সব দেশের স্বার্থই ক্ষুণ্ন হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে করে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হোক, এমনটা চাইছে না বড় কোন রাষ্ট্রই।
পাকিস্তান-ইরান উত্তেজনায় কার্যত লাভ শুধু ইসরাইল ও ভারতের। কারণ, ইসরাইল এই সুযোগে গাজায় তার নির্মমতা থেকে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর চোখ সরাতে পারলো। আবার, পাকিস্তানের তৃতীয় একটা সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হওয়া ভারতের জন্যও স্বস্তির। ইরান সীমান্তে সেনা সংখ্যা বাড়াতে হবে পাকিস্তানকে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানের বক্তব্য উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে ভারত বিশ্বজুড়ে বলতে পারবে, পাকিস্তানের আশ্রয়ে ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ’ আছে। একইভাবে পাকিস্তানের অভিযানের সূত্রে ইসরাইলও ইরানকে ‘সন্ত্রাসীদের’ লালনকারী হিসেবে দেখাতে পারবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি আমেরিকার কোন স্বার্থই নেই। এক কথায় উত্তর, খুব ভালোভাবেই আছে। গাজায় ইসরাইলি অভিযানের বড় সমর্থক আমেরিকা। কারণ, ওয়াশিংটন জানতো, এই সংঘর্ষ ছড়াবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। বেশি কিছু মুসলিম দেশকে সরাসরি কিংবা ছায়াযুদ্ধে নামানো যাবে।
বাস্তবে ঘটেছেও তাই। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন ১০০ দিন পার হওয়ার মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ল পাঁচটি মুসলিম প্রধান দেশ- ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরান ও পাকিস্তানে। অথচ দরকার ছিলো, এসব দেশের একসঙ্গে বসে ইসরাইলকে থামানো। সেটা না হওয়াতে, মুচকি হাসছে তেল আবিব ও ওয়াশিংটন।
ইরানের ভেতরে পাকিস্তানের মতো একটা দেশ মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, সেটা সেটাও যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও বড় এক সফলতা। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক আঁতাত বহু দিনের পুরোনো এবং পরীক্ষিত। ফলে পাকিস্তানের কোন পাল্টা জবাবকে মনে মনে স্বাগতও জানাবেন বাইডেন।
আবার বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে সবচেয়ে লাভ পশ্চিমাদের দখলে থাকা অস্ত্রের বাজার। এরইমধ্যে এই বাজার ফুলে ফেঁপে উঠছে। আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানির অস্ত্র কারখানাগুলোতে এই মুহূর্তে ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। তাই এটা স্পষ্ট যে, বড় শক্তিরা কোনো যুদ্ধই থামাতে চাইবে না।
অন্যদিকে, ইরান-পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। পাকিস্তানে চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগ রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতাও বহু পুরোনো। আবার ইরানের সাথে সৌদি সম্পর্কে বরফ গলাচ্ছে বেইজিং। তাই চীন কোন মতেই চাইবে না, পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হোক।
ইরান-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা কোন পথে?
মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা