মাথায় করে দই ফেরি করে, সেই বিক্রির টাকায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সমাজ সেবা করে চলেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জিয়াউল হক। দারিদ্রের কারণে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি। তাই অন্যের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বালাতে গড়ে তুলেছেন ১৪ হাজার বইয়ের এক পাঠাগার। তাঁর স্লোগান হয়ে উঠেছে 'বেচি দই, কিনি বই'। সাদামনের এই মানুষটি এবার পেয়েছেন একুশে পদক।
নিজের বাসায় দই তৈরি করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার মুসরিভূজা বটতলা গ্রামের জিয়াউল হক। পরে মাথায় করে বিক্রি করতেন এলাকায়। বাড়ি ভোলাহাট উপজেলার মুসরিভূজা গ্রামে। ‘বেচি দই, কিনি বই’ স্লোগানের রূপকার এই মানুষটি শিক্ষার আলো ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। ব্যাপকভাবে সমাজসেবায় জড়িয়ে পড়েন। ঘরবাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে টিউবওয়েলও স্থাপনে পাশে থাকেন তিনি।
তার গল্পটা শুরু আরও অনেক আগ থেকে। পঞ্চম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি দরিদ্র পরিবারের জিয়াউল হক। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বুঝতেন শিক্ষার কদর। নেমে পড়েন দুধ বিক্রিতে। পরিশ্রমের মজুরি থেকে এলাকার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বইসহ অন্যান্য উপকরণ কিনে দিতেন শিক্ষার আলো ছড়ানো মানুষটির। গড়ে তুলেন ‘জিয়াউল হক সাধারণ পাঠাগার। যেখানে এখন বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার।

বই বিলিয়ে বিদ্যালয়ে পড়তে না পারার বেদনা ভুলতে চেয়েছেন জিয়াউল হক। গরিব ছাত্রদের মধ্যে বই বিলি শুরু করেন। যত দিন পর্যন্ত সরকার বই বিনা মূল্যে দেওয়া শুরু করেনি, তত দিন পর্যন্ত বই দিতে থাকেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক শ্রেণির ছাত্রদের বই দিতে থাকেন জিয়াউল। তাঁর দেওয়া বই পড়ে ও আর্থিক সহায়তা পেয়ে অনেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে চাকরি করছেন।
এরপর দই বিক্রির টাকা জমিয়ে ১৯৬৯ সালে নিজ ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন পাঠাগার। এখন এখানে বইয়ের সংখ্যা ১৪ হাজার। তিনি শুরুর দিকে অভাবগ্রস্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রদান করতেন। বর্ষ শেষে আবার ফেরত নিয়ে আসতেন। পরে স্থানীয় মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পাঠ্যবই, কোরআন ও এতিমদের পোশাক, শীতবস্ত্র বিতরণ অব্যাহত রাখেন। ঈদে দুস্থদের মধ্যে কাপড় বিতরণ করছেন।

অর্থ দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেন আটটি মাদ্রাসা ও তিনটি এতিমখানার। গ্রামের বিভিন্ন ছিন্নমূল মানুষকে টিনের ঘরও তৈরি করে দেন আলোকিত এই মানুষ। এতিমখানায় ঈদুল আজহায় কোরবানির খাসি কিনে দেন। এভাবেই তিনি সমাজ সেবা করে আসছেন। তার তৈরি দইয়ের নামডাকও দেশজুড়ে। শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী জিয়াউল হক তার কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননাও পেয়েছেন।
জিয়াউল হকের একুশে পদক প্রাপ্তিতে আনন্দে ভাসছে ভোলাহাটসহ পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। তাকে অনেকেই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এই ভিড়ে আছেন সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। একুশে পদকের জন্য মনোনীত হওয়ার বিষয়ে জিয়াউল হক বলেন, এই পদক শুধু আমার একার নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী এ জন্য গর্বিত। এই পদক আমার সমাজসেবাকে আরও অনুপ্রাণিত করবে।

তিনি আরও বলেন, আমি কল্পনা করতে পারিনি, যে আমি এতো বড় একটা পদক পাওয়ার জন্য মনোনীত হব। জীবনের শেষ দিকে এসে কাজের স্বীকৃতি পেলাম। এখন মরেও শান্তি পাব। কী যে আনন্দ পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি জিয়াউল হকের হাতে একুশে পদক তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নারী ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান মনোনীতরা