আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ যেন যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। প্রথমে শুরুটা শান্তিপূর্ণ হলেও, পুলিশি অভিযান ও গণগ্রেপ্তারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেই বিক্ষোভ কার্যত সংঘাতের রূপ নিয়েছে। টানা কয়েক সপ্তাহের ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভের জেরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো থেকে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি’র এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১৮ এপ্রিলের পর থেকে এই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে অন্তত অর্ধশত গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে। এর মধ্যে শতাধিক বিক্ষোভকারী গ্রেপ্তার হয়েছে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমপরিমাণ গ্রেপ্তার হয়েছে।

বিক্ষোভ দমনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তা নিয়েছে। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সাঁজোয়া যান ও স্টান গ্রেনেডের মতো অস্ত্র ব্যবহার করেছে মার্কিন পুলিশ। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পুলিশ ফাঁকা গুলি চালিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশি অত্যাচার ও ধরপাকড়কে উপেক্ষা করেই বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ বৃহস্পতিবার বলেছে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যামিলটন হলে গুলি ছোড়ার ঘটনায় কেউ আহত হননি। এক পুলিশ সদস্য তার বন্দুকের সঙ্গে লাগানো ফ্লাশলাইট জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে তার বন্দুক থেকে একটি গুলি বেরিয়ে হলের দেয়ালে লাগে। তবে ঘটনাটি পর্যালোচনা করে দেখছে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তর। তদন্ত শেষে এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানাবে পুলিশ।

ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভে চরম বিপাকে পড়েছে বাইডেন প্রশাসন। সামনে নির্বাচন থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর বাইডেন নীরবতার কৌশল বেছে নেয়ায় সমালোচনার মুখে পদেন। পরে শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে মুখ খুলেন তিনি। শুক্রবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা যে কোনো নাগরিকের অধিকার। তবে অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সম্পত্তি ধ্বংস করাকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বলে না। সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করা বেআইনি। ভাঙচুর চালানো, ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেয়া, ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া এবং ক্লাস বাতিল করতে বাধ্য করা-এসবের কোনোটিই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নয়। তাঁর আরও যোগ করেন, ভিন্নমত গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু ভিন্নমত কখনোই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে না, বা অন্যের অধিকার কেড়ে নেবে না।
কিন্তু বাইডেনের কথায় চিড়ে ভিজেনি। কলম্বিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কমপক্ষে দুই শত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরাইলবিরোধী বিক্ষোভ চলমান আছে। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ দমনে ডাকা হয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে জোর করে তাঁবু সারানো হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার অভিযানও চলছে। তারপরও আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা আসছে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভকারীরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের প্রতি ইসরাইলের সঙ্গে বা গাজা যুদ্ধকে সমর্থনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধের আহবান জানিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরাইলি ‘গণহত্যা থেকে বিচ্ছিন্ন’ থাকার আহবানও জানিয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কি করে শিশু ও নারী হত্যাকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীরা।
চলমান বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় গত ১৭ এপ্রিল। এর পর তা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এসব বিক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম বিভিন্ন ঘটনার সরাসরি সম্প্রচার করে। বাদ যায়নি ইরানের গণমাধ্যমগুলো। আমেরিকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনের নাগরিকরা।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিক্ষার্থীদের এমন ব্যাপক বিক্ষোভ চলতি শতকে দেখা মেলিনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে গত শতকের ষাটের দশকের শেষ ভাগে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, সেটি এবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কলাম্বিয়াসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলন। ওই সময় পুলিশের গুলিতে চার শিক্ষার্থী নিহত হবার পর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের ধর্মঘট ও বন্ধ হয়ে যায় কয়েকশ’ বিশ্ববিদ্যালয়।
