বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ইস্যু। পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল, বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে- ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাচ্ছে। তবে, প্রশ্ন হলো, যদি ইরান সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চাইত, তাহলে গত দুই দশকে তা তৈরি করেনি কেন? আর যদি তা না-ই চায়, তাহলে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে কেন?
সালটা ছিল ২০০৩। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি একটি ঐতিহাসিক ফতোয়া জারি করেন। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়: ‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুদ কিংবা ব্যবহার ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম।’ এই ধর্মীয় সিদ্ধান্তটি শুধুই ধর্মীয় নয়, বরং একটি নৈতিক অবস্থানও, যেখানে নিরীহ মানুষের হত্যাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
অনেকের ধারণা, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই একটি দেশ নিরাপদ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলেও ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানে অংশ নিতে বাধ্য হয়। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে।
এমনকি রাশিয়া, যাদের বিশ্বের সর্বোচ্চ পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ রয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর সাথে কৌশলগতভাবে চাপে পড়েছে। এছাড়া, ইসরাইলও, অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়া সত্ত্বেও ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এ বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
একথা সত্য যে, পরমাণু অস্ত্র বানানোর প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম ইরানের রয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনাই ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
এদিকে, ইসরাইলি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে থাকা ১৮ হাজার সেন্ট্রিফিউজের বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে, ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম নষ্ট হয়নি। কিছু ইউরেনিয়াম বিশেষ পাত্রে আলাদা সংরক্ষণ করা ছিলো, যা এখনো ইরানি বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করতে পারেন।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাসচিব জানিয়েছেন, হামলার আগেই ইরান তাদের অনেক ইউরেনিয়াম মজুত সরিয়ে ফেলেছিল। ইরান ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি এনপিটি-এর সদস্য হয়। সেই অনুযায়ী, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রাখে।
তবে, ইরান পরমাণু বোমা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে না- জানা সত্ত্বেও ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র জুন মাসে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান আইএইএ’র নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংস্থাটির সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করে।
তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি একটি ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে একে ‘হারাম’ ঘোষণার পরেও দেশটি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। তাই একে রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছেন তারা। বোমা বানানোর ঘোষণা না দিলেও, ইরান এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে যাতে প্রয়োজনে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
গাজায় শিশুসহ আরও ৭৮ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলো ইসরাইল
ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়েই পুতিনকে হুমকি দিলেন ট্রাম্প