বাংলায় কথা বলার কারণে দীর্ঘদিনের চেনা জায়গায়ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন এক শ্রমিক। পরে তিনি তিনদিন মন্দিরে লুকিয়ে থেকে বাড়ি ফেরেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা সাইফুল শেখ ১৪ বছর ধরে কাজ করছিলেন মুম্বাইয়ের একটি কারখানায়। বাংলায় কথা বলার কারণে ক্রমাগত হেনস্থার জেরে ছাড়তে হল সেই চেনা জায়গা। পরিবার নিয়ে পালিয়ে একটি মন্দিরে ঠাঁই নেন বিষ্ণুপুরের শ্রমিক সাইফুল। সেখানেই লুকিয়ে কাটে তিন দিন। বৃহস্পতিবার কোনোরকমে নিজ এলাকায় ফিরেছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের কুলেরহাটি পঞ্চায়েতের সর্দার পাড়ার বাসিন্দা সাইফুল (৪০) প্রায় ১৪ বছর আগে মুম্বাইয়ের দাদরে ওই কারখানায় কাজে যোগ দেন। ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী ও ছেলেকে (১৩) নিয়ে থাকতেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সম্প্রতি।
সাইফুল জানান, বাংলায় কথা বলায় বাংলাদেশি বলে তাকে নানানভাবে হেনস্তা করা শুরু করে স্থানীয়রা। পুলিশও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনি জানান, তাকে বাইরে বের হলেই মারধরও করা হতো। কার্যত তিনি ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দেন।
তিনি দাবি করেন, এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে ওখানে থাকার জন্য মাথা পিছু ৫০ হাজার করে টাকা চায়। এসবের জেরে তাকে কাজে না করে দেয় কারখানা মালিক।
কাজ বন্ধ হয়ে গেলে সঞ্চিত অর্থও প্রায় শেষ হয়ে যায় সাইফুলদের। বাড়িওয়ালাও ঘর ছেড়ে দিতে বলেন। বাংলার বেশ কিছু শ্রমিক ছিলেন সেখানে। বেশিরভাগই একা থাকতেন। সকলেই যে যার মতো লুকিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু পরিবার থাকায় আটকে যান সাইফুল।
শেষ পর্যন্ত সপ্তাহ খানেক আগে পরিবার নিয়ে লুকিয়ে লোকাল ট্রেনে চেপে বসেন। দাদর থেকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে কল্যাণে সাইফুলের চেনা দু’-এক জন ছিলো। সেখানেই এসে নামেন। তবে সেখানেও থাকার জায়গা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত একটা মন্দিরে ঠাঁই নেন তারা। পুরোহিত মন্দির চত্বরে থাকতে দেন সাইফুলদের।

গত সোমবার এলাকার সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘এক ডাকে অভিষেক’ প্রকল্পের নম্বর জোগাড় করে সমস্যার কথা জানান সাইফুল। এরপরই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এলাকার জেলা পরিষদ সদস্য বাবান গাজি। তিনি কিছু টাকা পাঠান। ট্রেনে উঠে পড়তে বলেন। পরিবার নিয়ে মঙ্গলবারই ট্রেনে উঠে পড়েন সাইফুল। টিকিট কাটার সুযোগও পাননি। কোনোরকমে প্ল্যাটফর্ম টিকিট কেটেই ট্রেনে চাপেন। বৃহস্পতিবার এলাকায় ফেরেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে এখনো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাইফুল। বলেন, ১৪ বছর দাদরে ছিলাম। চেনা লোকজন এভাবে বদলে যাবে ভাবতেও পারিনি। শেষপর্যন্ত পালাতে হলো। কল্যাণে মন্দিরের ঠাঁকুরমশাই খুবই সাহায্য করেছিলেন। আমাদের লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু ওইভাবে আর কতদিন! শেষ পর্যন্ত এক ডাকে অভিষেকে ফোন করি। ওরাই সাহায্য করে। ফেরার পর স্থানীয় নেতৃত্ব দেখা করেছেন। কিছু টাকা দিয়েছেন। কিন্তু তাতে আর কতদিন চলবে?
আবার ফিরবেন ভিন্ন রাজ্যে? এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল বলেন, এলাকায় কাজ নেই। কিন্তু বাইরে যাওয়ারও ইচ্ছা নেই। বাইরে গিয়ে মার খাওয়ার থেকে এলাকায় ভিক্ষা করে খাবো।
বিষ্ণুপুরের বিধায়ক তথা মন্ত্রী দিলীপ মণ্ডল বলেন, আগেও এলাকার একাধিক শ্রমিককে ফেরানো হয়েছে। এক্ষেত্রেও খবর পেয়েই ওই শ্রমিককে ফেরানোর ব্যবস্থা করি। বাংলা বলায় এভাবে হেনস্তা কাম্য নয়। পরিবারটির পাশে আছি। মুখ্যমন্ত্রীও পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
একাত্তরে গণহত্যা: পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বললো বাংলাদেশ