যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সারাদেশে পালিত হচ্ছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক বীর সন্তান। বাঙালির সেই আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য আজ সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত; ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে এই গৌরবময় দিনটি।
শনিবার একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। ভোরে নগ্ন পায়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে প্রভাতফেরি নিয়ে হাজির হন সর্বস্তরের মানুষ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
সিলেট ও মৌলভীবাজার
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, “সর্বস্তরে মাতৃভাষা চর্চা হোক আগামীর অঙ্গীকার।” মৌলভীবাজারেও রাত ১২টা ১ মিনিটে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের শহীদ মিনারে জেলা প্রশাসন ও বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা জানান।
রংপুর ও রাজশাহী
রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন মানুষ। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা সংরক্ষণের দাবিও ওঠে সেখানে। রংপুরে বিভাগীয় কমিশনার ও সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সর্বস্তরে শুদ্ধ বাংলা চর্চার দাবি জানানো হয়।
চট্টগ্রাম ও বরিশাল
চট্টগ্রামে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে প্রভাতফেরি নিয়ে শহীদ মিনারে ভিড় করেন বিভিন্ন সংগঠনের শিশু-কিশোররা। বরিশালেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যথাযথ মর্যাদায় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দিনটি পালন করছে।
লক্ষ্মীপুর ও পঞ্চগড়
লক্ষ্মীপুরে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বলেন, “দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” পঞ্চগড়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, “৫২ সালে আমরা যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলাম, ভবিষ্যতেও শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকব।”
কুড়িগ্রাম ও বগুড়া
কুড়িগ্রামে বিএনপি ও অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মিলি কায়কোবাদ বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর পর আজ শহীদ মিনারে আসতে পেরে ভালো লাগছে।” বগুড়ায় শহীদ মিনারে আসা মানুষ বাক-স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জয়পুরহাট ও টাঙ্গাইল
জয়পুরহাটে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী সরকারি কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতার ওপর জোর দেন। টাঙ্গাইলে কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কুমিল্লায় কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রী হাজী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ ইয়াছিন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন।
খাগড়াছড়ি ও পিরোজপুর
খাগড়াছড়িতে জেলা প্রশাসক ও পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। পিরোজপুরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর এবং সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
যশোর
যশোরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের চেতনা।” জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী এসময় শ্রদ্ধা জানান।
রূপগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু বলেন, “৫২-এর আন্দোলন আমাদের অধিকার আদায় শিখিয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি।” ১৭ বছর পর মুক্ত পরিবেশে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন তিনি।
গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. কেএম বাবর দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য গোপালগঞ্জের স্থানীয় বেদিতে শ্রদ্ধা জানালেন।
জয়পুরহাট
জয়পুরহাটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। পরে জেলা জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান সাঈদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
মানিকগঞ্জ ও জামালপুর
মানিকগঞ্জে ভাষা শহীদ রফিকের পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের সাথে প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা জানান। জামালপুরে সংসদ সদস্য শাহ মোঃ ওয়ারেছ আলী মামুন ও জেলা প্রশাসনের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে।
ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছাড়াও ভাষা সৈনিক দবিরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিত্রাঙ্কন ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা
সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। নেত্রকোণায় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ; সেখানে বক্তারা ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
ঝিনাইদহ ও পাবনা
ঝিনাইদহে নীরবতা ও শ্রদ্ধার আবহে জেলা প্রশাসন ও বিএনপি নেতাকর্মীরা ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। পাবনাতেও জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও পাবনা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে দিনভর দোয়া ও আলোচনা সভার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
মাগুরা ও শেরপুর
মাগুরায় সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। শেরপুরেও চকবাজারস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন ও হাতের লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
সারা দেশে শহীদ মিনার এলাকাগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অধিকাংশ স্থানেই দাবি উঠেছে সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার।
