ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর অব্যাহত সদস্য সংগ্রহ এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার প্রকাশ্য প্রদর্শনী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরান তার এই সশস্ত্র প্রক্সিগুলোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে।
গত দুই বছরে ইরানের আঞ্চলিক শক্তি বলয় প্রায় ধসে পড়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, সিরিয়ার মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে এবং ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বহু শীর্ষ কমান্ডার প্রাণ হারিয়েছেন। এই বিপর্যয়ের মুখেও তেহরান তার ইরাকি মিলিশিয়াদের এতদিন সরাসরি যুদ্ধে নামায়নি, যা তারা এখন শুরু করতে যাচ্ছে।

ইরাককে কেন বেছে নিল ইরান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান তার সীমান্তের সবচেয়ে কাছে থাকা এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে এতকাল রক্ষা করে আসছিল যাতে তারা মার্কিন বা ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস না হয়। কৌশলগত বিশেষজ্ঞ আলা আল-নাশুয়ার মতে, ইরান ইরাককে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে।
তিনি বলেন, ইরাকের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে এটি এই অঞ্চলের সামরিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ইরান ইরাকের প্রায় প্রতিটি প্রদেশে তাদের গোয়েন্দা ও সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে এবং সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত করেছে।
সামরিক প্রস্তুতি ও ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বদর অর্গানাইজেশন, কাতায়েব হিজবুল্লাহ এবং হারাকাত আল-নুজাবার মতো গোষ্ঠীগুলো ইরানের সমর্থনে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। গত মাসে ‘আউলিয়া আল-দাম’ নামক একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে ট্রাকযোগে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যেতে দেখা যায়। একে ইরাকের ভেতরে একটি ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

কেন এই তৎপরতা এখন?
আন্তর্জাতিক কৌশলগত বিশেষজ্ঞ আমের আল-সাবায়লে মনে করেন, ইরানের ‘একীভূত ফ্রন্ট’ বা প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। সিরিয়া ও লেবানন ফ্রন্ট দুর্বল হয়ে পড়ায় এখন ইরাকই ইরানের শেষ ভরসা। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরাককে সক্রিয় করা মানেই ইরান রক্ষা পাবে এমনটি নয়। বরং এটি হবে ইরানের শেষ তুরুপের তাস।
ইরাকি রাজনৈতিক গবেষক রাফিদ আল-আতোয়ানি মনে করেন, ওয়াশিংটন এবার রাষ্ট্রবহির্ভূত এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ফাইল চিরতরে বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। কিছু গোষ্ঠী এখন মার্কিন শক্তির ভয়ে নিশ্চুপ থাকলেও কট্টরপন্থীরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সরকারের অবস্থান ও ঝুঁকি
মিলিশিয়াদের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব ইরাক সরকারের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরাক কোনো দেশের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হবে না এবং তারা আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়।
ইরাক সেন্টার ফর ফিউচার স্টাডিজের পরিচালক তালহা আল-দোসারি মনে করেন, ইরান এখন তার হাতে থাকা শেষ কার্ডগুলো বিশ্বকে দেখাচ্ছে। তেহরান বার্তা দিতে চায় যে, পরবর্তী সংঘাত আগের মতো হবে না, বরং এটি আরও জটিল এবং বহুমুখী হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ইরাক নিজেই সরাসরি মার্কিন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
সূত্র: আরহুরা.কম
