মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা যখন তুঙ্গে, তখন চীনের সাথে ইরানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির খবর আন্তর্জাতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ইরান ও চীনের মধ্যে একটি অত্যাধুনিক জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খবর রয়টার্সের।
এই চুক্তির খবর এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আল্টিমেটাম অনুযায়ী যুদ্ধের আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র বিশাল নৌবহর মোতায়েন করেছে।
যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মতো অস্ত্র: ইরান চীন থেকে সিএম-৩০২ মডেলের সুপারসোনিক ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে যাচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ২৯০ কিলোমিটার এবং এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব নিচ দিয়ে উড়তে সক্ষম, যার ফলে জাহাজের রাডার বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে একে শনাক্ত করা বা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হলে তা অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সরাসরি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে এবং যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দেবে।

দীর্ঘমেয়াদী আলোচনা ও সাম্প্রতিক সফর: তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে গত দুই বছর ধরে আলোচনা চললেও ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়। গত গ্রীষ্মে ইরানের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাসুদ ওরায়ে বেইজিং সফর করেন, যা এই চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির বিষয়ে কোনো তথ্য জানে না বলে দাবি করেছে।
মার্কিন মোতায়েন ও ট্রাম্পের অবস্থান: বর্তমানে ইরানের উপকূলের কাছাকাছি দূরত্বে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড তাদের স্ট্রাইক গ্রুপ নিয়ে এই অঞ্চলে অবস্থান করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন; হয় তেহরানকে পরমাণু ইস্যুতে নতুন চুক্তিতে আসতে হবে, অন্যথায় সামরিক হামলার মুখোমুখি হতে হবে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এই অচলাবস্থা নিরসনে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধাবোধ করবেন না।

চীন-ইরান সামরিক সম্পর্কের গভীরতা: এই চুক্তিটি কেবল অস্ত্র ক্রয় নয়, বরং চীন ও ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। চীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় সমর্থন দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং চায় না ইরানে কোনো পশ্চিমা-ঘেঁষা সরকার ক্ষমতায় আসুক, কারণ তা চীনের আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তিটি ২০০৬ সাল থেকে ইরানের ওপর আরোপিত এবং সম্প্রতি পুনরায় সক্রিয় হওয়া জাতিসংঘ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার: গত বছরের যুদ্ধের ফলে ইরানের সামরিক ভাণ্ডারে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, চীনের এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তা পূরণ করতে সহায়তা করবে। সিএম-৩০২ ছাড়াও ইরান চীনের কাছ থেকে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক-রোধী ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

চীনের এই যুদ্ধজাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র যদি ইরানের হাতে পৌঁছায়, তবে তা পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। জেনেভায় বৃহস্পতিবারের পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হলে এই নতুন সমীকরণ যুদ্ধের ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
