ইরানের আকাশ এখন বারুদ আর কান্নার বাষ্পে ভারী। মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর যৌথ বিমান হামলায় দেশটির দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো দেশে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবারের সেই ভয়াবহ হামলায় খামেনির সাথে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর কন্যা, জামাতা, নাতি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নেতৃত্বের ওপর এটিই সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘মহা অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ৪০ দিনের শোক পালনের পাশাপাশি দেশজুড়ে সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন। তেহরান থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, নেতার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ঢল নেমেছে। মাশহাদ শহরের ইমাম রেজা মাজারে অনুসারীদের কান্নায় ভেঙে পড়তে এবং শোকে মূর্ছা যেতে দেখা গেছে। শিরাজ, ইয়াসুজ ও লোরেস্তানেও শোকাতুর জনতার বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।

খামেনির মৃত্যুতে শুধু ইরান নয়, প্রতিবেশী ইরাকেও তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। বাগদাদের সুরক্ষিত গ্রিন জোনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের দিকে উত্তেজিত জনতা অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে। এদিকে পাকিস্তানের করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই শোকের আবহাওয়ার মধ্যেই ইরানের কিছু শহর যেমন কারাজ ও ইসফাহানে উল্লাসের খবরও পাওয়া গেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা- ইরনা জানিয়েছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাবে তিন সদস্যের একটি অস্থায়ী কাউন্সিল। এই কাউন্সিলে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য। ইতিমধ্যে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশকে বিভক্ত করার কোনো চেষ্টা সহ্য করা হবে না।

আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ২৭টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং তেল আবিবের ইসরায়েলি স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কিছু দেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, পাল্টা আঘাত করলে ইরানকে এমন শক্তির মুখোমুখি হতে হবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
যুদ্ধের এই ভয়াবহতায় সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, ইরানের ২৪টি প্রদেশে চালানো হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১৪৮টি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে শোক ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের উপদেষ্টা হারলান উলম্যান এই হত্যাকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি "বড় ভুল" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলায় নেতৃত্ব পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয় না, বরং এটি আলোচনার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
