ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি এবং অভ্যন্তরীণ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। যদিও তেহরান এখন পর্যন্ত এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনটিই করেনি। বিশ্বের বেশিরভাগ সংকাদমাধ্যমের এই মুহূর্তের প্রধান শিরোনাম এই খবর।
মঙ্গলবার ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণায় দাবি করেছেন, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি নিহত হয়েছেন। একই দিনে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তারা তেহরানের হৃদপিণ্ডে সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালিয়ে বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিকেও ‘হত্যা’ করেছে।

৬৭ বছর বয়সী আলি লারিজানিকে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ মনে করা হয়। যদি তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়, তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিনে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর এটিই হবে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড।
মজার বিষয় হলো, ইসরাইলি দাবির পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম লারিজানির হাতে লেখা একটি নোট প্রকাশ করেছে। যেখানে তিনি মার্কিন হামলায় নিহত ৮৪ জন ইরানি নাবিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তবে এটি তাঁর বেঁচে থাকার প্রমাণ কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। লারিজানিকে সর্বশেষ গত শুক্রবার তেহরানে কুদস দিবসের র্যালিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে দেখা গিয়েছিল।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা তেহরানের কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যা করেছে। গত ছয় বছর ধরে তিনি ‘বাসিজ’ ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন। বাসিজ হলো ইরানের একটি শক্তিশালী আধা-সামরিক বাহিনী, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং যে কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে।

ইসরাইলি আগ্রাসনের মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আসা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানা গেছে। একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, মুজতবা খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে হাঁটু গেড়ে বসতে না দেখা পর্যন্ত এবং তারা পরাজয় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত শান্তির কোনো সুযোগ নেই।
যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই জলপথ উন্মুক্ত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের সাহায্য চাইলেও তারা এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা ক্যালাস জানিয়েছেন, কেউ তাদের দেশের মানুষকে এই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে রাজি নয়; তারা কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে।
এদিকে ইরান শুধু ইসরাইল নয়, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা জোরদার করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ড্রোন হামলায় তেল লোডিং সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে ৪ শতাংশ বেড়ে গেছে।

লারিজানি এবং সোলেইমানির মতো শীর্ষ নেতাদের হারানো ইরানের জন্য বড় ধাক্কা হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে না। বরং তেহরান এখন আরও দীর্ঘমেয়াদী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-সিএনএন-রয়টার্স-বিবিসি
