বাবার লাশ সৎকার না করেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন ইরা, এখনো চলছে দেশ গড়ার লড়াই

পিতা হত্যার প্রতিশোধে একাত্তরের রণাঙ্গনে

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

মুক্তিযুদ্ধ বলতেই রাইফেল হাতে তরুণ যোদ্ধা, মুহুর্মুহু গোলাগুলি, বধ্যভূমির কান্না, আর বিজয়ের উল্লাস। কিন্তু ১৯৭১-এ সশস্ত্র যুদ্ধের অন্তরালে চলছিল আরেক নীরব যুদ্ধ, যেখানে যোদ্ধারা অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে আহত আর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষকে ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন জীবনের স্বাদ। বাবাকে হত্যার পর তার সৎকার না করেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কিশোরী ইরা কর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হাসপাতালের সেই যুদ্ধে কেমন করে যোগ দিয়েছিলেন সেই গল্পই একাত্তরকে জানাচ্ছিলেন সাভারের এনায়েত পুরে নিজ বাড়িতে বসে।

রাজবাড়ীর শিবরামপুর ইরা করের পিতা জিতেন্দ্র নাথ করকে ১৯৭১ এর ৫ মে দিনের বেলায় হত্যা করে বিহারী ও স্থানীয় রাজাকাররা। বাবার লাশ সৎকার না করেই পাড়ি দেন অজানার উদ্দেশে। টানা নয় দিন পায়ে হেঁটে ভারত সীমান্তে পৌঁছেন তারা ৷ সেই সময়ের দুঃসহ স্মৃতির কথা স্মরণ করে ইরা কর বলছিলেন কারো জীবনে যুদ্ধ যেনো না আসে।

রাজবাড়ীর শিবরামপুর গ্রামে জন্ম ইরা করের। পিতা জিতেন্দ্র নাথ কর এবং মা সন্ধ্যা রাণী কর৷ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ৫ মে তার বাবাকে দিনের বেলায় হত্যা করে বিহারী ও স্থানীয় রাজাকাররা৷

ভারতেই দূর সম্পর্কের এক দাদার সঙ্গে কথা বলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য আমি আর আমার বড় বোন গীতা কর নাম লিখাই। স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য গোবরা শিবিরে প্রথম যে পাঁচ জনকে নিয়ে নারীদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল তাদের অন্যতম এই দুই বোন৷পেছনে বাবার হত্যা, পরিবার বিচ্ছিন্নতা আর মুক্তিকামী দেশের স্বপ্ন। এরপর ধীরে ধীরে শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে আরো নারী এসে যোগ দেন সেই প্রশিক্ষণ কোর্সে। বলছিলেন ৪০০ মেয়ে ৪০০ রকমের জীবনের গল্প নিয়ে। তাদের মধ্যে ছিলেন শিরিন বানু মিতিল, লায়লা পারভীন বানু, খাদিজা আখতার, মনিকা ব্যানার্জিসহ আরো অনেকে অস্ত্র চালানো, ক্রলিং, গোয়েন্দাগিরিসহ প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণে যোগ দিয়ে ছিলো। প্রশিক্ষণের নানা দিক তুলে ধরে ইরা কর বলেন, ২ জুলাই রবিবার প্রথম আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়৷ আমাদের একটা ধুতি, একটা মগ এবং একটা টিনের থালা দেয়া হয়েছিল৷ প্রশিক্ষণের সময় আলো জ্বালানো যাবে না। কোন আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করা যাবে না৷ যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা আমাদের প্রশিক্ষণ দিতেন৷ ফরাসি বিপ্লব, কিউবার বিপ্লবসহ বিশ্বের ঐতিহাসিক নানা ঘটনা উল্লেখ করে আমাদের উৎসাহ যোগাতেন তারা৷

প্রশিক্ষণ শেষে ১০টাকা হাতে দিয়ে ১৫ জনকে ট্রেনে তুলে দেয়া হয় আগরতলা সীমান্তে যুদ্ধে যেতে। পথ ভুলসহ নানা কারণে পরে যুক্ত হন বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে। বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন ডা. সেতারা বেগম, ডা. এমএ মবিন, ডা. নাজিম, ডা. মোর্শেদসহ সবাই আমাদের অভিনন্দন জানান৷ তারা বলেন, তোমরা আমাদের সাথে কাজ করো৷ তোমাদের আর কোন চিন্তা নেই৷ সেখানে সুলতানা কামাল, তার বোন সাঈদা কামাল, নিলীমা বৈদ্য, বাসনা চক্রবর্তী, পদ্মা রহমানসহ অনেকের সাথেই কাজ করার সুযোগ হয়েছে ৷

সময় যতই গড়াতে থাকে, রণাঙ্গনে চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা ততই বাড়তে থাকে। এই সবকিছুর নীরব সাক্ষী ইরা কর । হাসপাতালটিতে দিন দিন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আহতদের কারও হাত উড়ে গেছে, কারও পা নেই। একটু সুস্থ হয়েই আহত মুক্তিযোদ্ধারা আবারও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হাসপাতালের বেডে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও হাসি মুখে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখতো আহত মুক্তিযোদ্ধারা। অনিশ্চয়তার সেই জীবনে চিকিৎসার পাশাপাশি মনোবল উজ্জীবিত করতে দেশের গানও শোনাতে যোদ্ধাদের।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিন ১৭ ডিসেম্বর ক্যাম্প থেকে অনেকেই দেশের দিকে রওনা দিলেও গীতা করসহ কয়েকজন সেখানে থেকে গেলেন। হাসপাতালে তখনও কিছু আহত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। এতদিন পর্যন্ত কোন আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগাযোগ ছিল না তাদের৷ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বলছিলেন দেশের যুদ্ধ শেষ হয়নি।তাই পরে সেখান থেকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি কুমিল্লার সোনামুড়া সীমান্ত দিয়ে স্বাধীন দেশে প্রবেশ করেন গীতা ও ইরা দুবোন। দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। দুবোন ফিরে গেলেন রাজবাড়ীর গ্রামের বাড়িতে। ততদিনে বাড়ি লুট হয়ে গেছে। ঘর-দরজা ভাঙা; তার মধ্যেই পরিবারের ১২ সদস্য মাথা গুজে আছে। বাবা-কাকা মারা যাওয়ায় আয়ের সংস্থান নেই, সবার জন্য দুবেলা দু-মুঠো ভাত জোগাড় করাই তখন দুঃসাধ্য।

এরপর ঢাকায় এসে ইস্কাটন রোডে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আহতদের জন্য কাজ করেন ইরা কর আর গীতা কর দুবোন। পরে সাভার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে যোড় দেন। সেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে অবসর নিয়েছেন বড় বোন গীতা কর৷ ইরা কর এখনো সেখানেই কাজ করেছেন৷ এক সময় ফ্রান্স থেকে অণু-জীববিজ্ঞান বিষয়ে কোর্সও সম্পন্ন করেন ইরা কর। সাভারের এনায়েতপুরে স্থায়ী নিবাস গেড়েছেন। দুই মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন ।তারা নিজে সংসার চাকরী করছেন।স্বামীর মৃত্যু তাকে কিছুটা একাকী করেছে।অবসর সময়ে দেশাত্ববোধক গান শোনেন এবং নিজেও গান।

যুদ্ধ দিন আর এ দেশ নিয়ে কোন হতাশা নেই ইরা করের বরং স্বপ্ন দেশটা এগিয়ে যাবে। দেশ স্বাধীন করতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পেরেছেন – এটাই বড় তৃপ্তি। শুধু বলছিলেন রক্তের ঋণ শোধ হবেনা।

একাত্তর/আরএ
পটুয়াখালীতে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক নেতার বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে। জেলা জমিয়তে উলামার সভাপতি...
মা আর ভালোবাসার মানুষটিকে কাঁদিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা তানেসউদ্দীন। কথা ছিলো যুদ্ধ শেষে ফিরে এসেই ভালোবাসার মানুষটির সাথে ঘর বাঁধবেন। কিন্তু তা আর হলো না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে, ১৯ মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ হয় গাজীপুরে। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরসস্ত্র করা হবে এমন খবরে, সংগ্রাম পরিষদের ডাকে রাস্তায় রাস্তায়...
মহান মুক্তিযুুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তের গারো পাহাড়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনে বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। 
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফ্যাসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মনোনীত হয়েছেন দেলোয়ার হোসেন শাহীন। 
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিদেশে পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দেশকে আবারও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু।
জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি মোছা. রিম্পাকে (২১) গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর