ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নতুন এবং চরম শিখরে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন কর্তৃক জার্মানি থেকে ৫,০০০ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর এই উত্তেজনা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এই সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়ার পর শনিবার জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, এখন থেকে ইউরোপীয়দের নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে।
গত এক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডারিখ মার্জের মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তীব্র কথা কাটাকাটি চলছে। চ্যান্সেলর মার্জ মন্তব্য করেছেন, ইরান সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্র অপমানিত হচ্ছে এবং তেহরান আলোচনার টেবিলে হোয়াইট হাউসকে কৌশলে হারিয়ে দিচ্ছে। তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেন এবং আফগানিস্তান ও ইরাকের উদাহরণ টেনে সতর্ক করেন, যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।

মার্জের এই সমালোচনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় অভিযোগ করেন, চ্যান্সেলর মার্জ সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকাকে সমর্থন করছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প জার্মানি থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেয়ার হুমকি দেন এবং শেষ পর্যন্ত ৫,০০০ সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ কার্যকর করেন। উল্লেখ্য, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মিত্র দেশগুলোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন।
বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে জার্মানির ওপর নির্ভরশীল। এখানে অবস্থিত রামস্টেইন বিমান ঘাঁটি এবং ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টার ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি পূর্ববর্তী ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পিস্টোরিয়াস জানিয়েছেন, আংশিক সেনা প্রত্যাহার হলেও এটি জার্মানির সামগ্রিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে না।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিস্টোরিয়াস দাবি করেছেন, জার্মানি এখন সঠিক পথেই এগোচ্ছে। দেশটি তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে, যার লক্ষ্য বর্তমান ১,৮৫,০০০ সৈন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে ২,৬০,০০০-এ উন্নীত করা। এছাড়া সামরিক সরঞ্জামের দ্রুত সংগ্রহ এবং নতুন অবকাঠামো তৈরির ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং সীমিত বাজেটের কারণে ইউরোপের দেশগুলোর জন্য এই নিরাপত্তা শূন্যতা পূরণ করা দীর্ঘ সময়ের এবং চ্যালেঞ্জিং একটি প্রক্রিয়া হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সামগ্রিকভাবে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের এই দুই শক্তিশালী মিত্রের মধ্যে যে ফাটল ধরেছে, তা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং ন্যাটো এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার সমীকরণেও বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-রয়টার্স-আল জাজিরা-মিডল ইস্টন আই
