আমেরিকার আড়াইশো’ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবার ২৫০ ডলারের নতুন ব্যাংক নোটে নিজের ছবি বসানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজের ব্যক্তিগত ছাপ রেখে ঐতিহ্য ভাঙার যে ধারা রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট শুরু করেছেন, এটি হতে যাচ্ছে তার সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় নজির।
গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন পোস্ট প্রথম এই খবরটি সামনে আনে, যেখানে জানানো হয় নতুন এই নোটের খসড়া নকশায় ট্রাম্পের এক তীব্র ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে গত দেড় শতাব্দীর (১৫০ বছর) মধ্যে এই প্রথম কোনো জীবিত ব্যক্তির, তা-ও আবার একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টের ছবি মার্কিন মুদ্রায় স্থান পাবে। আমেরিকার বর্তমান আইন অনুযায়ী কোনো জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি দেশটির মুদ্রায় ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

গত বৃহস্পতিবার এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই মুহূর্তে মার্কিন প্রতিনিধি সভা এবং সিনেটের সামনে একটি নতুন বিল বা আইন প্রস্তাব আকারে রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন করা, যাতে একজন জীবিত ব্যক্তি হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি ২৫০ ডলারের নোটে দেওয়া যায়।
নিজের বসের পক্ষে সাফাই গেয়ে বেসেন্ট আরও যোগ করেন, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর নোটে দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্টের ছবি থাকার মধ্যে আমি অন্যায্য বা আপত্তিকর কিছু দেখি না। তিনি জানান, আইন পাস হলে ট্রেজারি বিভাগ নোটটি ছাপানোর আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, তবে তারা আইনের বাইরে যাবে না।
ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা নোটের একটি মক-আপ বা ডামি ডিজাইনে দেখা গেছে, সেখানে লেখা রয়েছে আমেরিকা ২৫০ অ্যানিভার্সারি। এটি মূলত ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০ বছর পূর্তিকে নির্দেশ করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরই ট্রেজারি বিভাগে ট্রাম্পের নিযুক্ত দুই কর্মকর্তা ‘ব্যুরো অব এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিং’ (নোট ছাপানোর সরকারি সংস্থা)-এর কর্মীদের ওপর এই নোটের প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক নকশা তৈরি করার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সংস্থার কর্মচারীরা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনাটি নিয়ে ভেতরে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল কারণ এটি সরাসরি ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করে।
সংস্থার ডিরেক্টর প্যাট্রিসিয়া সোলিমেন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ইউএস ট্রেজারার ব্র্যান্ডন বিচসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের আইনি ও পদ্ধতিগত বাধাগুলোর বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে দ্বিমত পোষণের মাশুল তাঁকে হাতেনাতে গুনতে হয়েছে।

সোলিমেনকে আকস্মিকভাবে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় বদলি করা হয়েছে বলে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অবশ্য ট্রেজারি বিভাগের এক নারী মুখপাত্র এএফপি-কে জানিয়েছেন, ব্যুরোটি শুধু প্রাক-পরিকল্পনা ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করছে এবং কংগ্রেসের সবুজ সংকেত পাওয়ার আগে ট্রেজারার ব্র্যান্ডন বিচ কর্মীদের নোটটি প্রিন্ট করার কোনো নির্দেশ দেননি।
আইনি বাধা বা সমালোচনা, কোনো কিছুই ট্রাম্পকে দেশের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর নাম ও ছবি সেঁটে দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারছে না। সমালোচকরা একে ট্রাম্পের চারপাশে একটি ‘ব্যক্তিত্ববাদ’ বা ‘কাল্ট অব পার্সোনালিটি’ তৈরির নগ্ন চেষ্টা বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্পের নিযুক্ত সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘ইউএস কমিশন অব ফাইন আর্টস’ সর্বসম্মতিক্রমে ২৪ ক্যারেটের খাঁটি সোনার একটি বিশেষ স্মারক মুদ্রা তৈরির অনুমোদন দেয়।

এখানেই শেষ নয়; সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমেরিকার বিখ্যাত ‘জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস’ এবং ‘ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিস’-এর নাম পরিবর্তন করে সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মার্কিন বিচার বিভাগ এবং কৃষি বিভাগের সদর দপ্তরের দেয়াল থেকে এখন ট্রাম্পের বিশাল প্রতিকৃতি ঝুলে থাকতে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, খুব শীঘ্রই মার্কিন নাগরিকদের পাসপোর্টের পাতাতেও দেখা মিলবে ট্রাম্পের অবয়বের!
ডেমোক্র্যাটদের তীব্র ক্ষোভ: ২৫০ ডলারের নোটে ট্রাম্পের ছবি দেওয়ার এই বিলটি গত বছর কংগ্রেসে উত্থাপিত হলেও তা এতদিন ধামাচাপা পড়ে ছিল। কিন্তু নতুন করে এই তোড়জোড় শুরু হওয়ায় বিরোধী ডেমোক্র্যাট শিবিরের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
মার্কিন সিনেটের ব্যাংকিং কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার নজিরবিহীন প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এই হাস্যকর ও ন্যাক্কারজনক পদক্ষেপের মাধ্যমে হোয়াইট হাউস আসলে শুধুই প্রেসিডেন্টের অহংকার ও আত্মতুষ্টিকে তোষামোদ করছে। ঐতিহ্য বনাম ট্রাম্পের আত্মপ্রেমের এই লড়াই এখন মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন ‘রসালো’ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি
