ইতালির ঐতিহ্যবাহী ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের খ্যাতনামা অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বর ঘটনার পর সোমবার সকালে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন তিনি।

রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' সিনেমার প্রদর্শনীর জন্য ভেনিস উৎসবে যান বাঁধন। গত ৬ সেপ্টেম্বর ‘সালা দারসেনা’ থিয়েটারে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। পরদিন রাতে মেস্ত্রে এলাকায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময় একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তার ওপর চড়াও হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেদনের তথ্য মতে, আক্রমণের সময় শুধু দুর্ব্যবহার বা স্লোগানই দেওয়া হয়নি, বরং বাঁধনের দিকে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারা হয় এবং তার ওপর শারীরিক আক্রমণ চালানো হয়। ঘটনার পর তিনি স্থানীয় ইতালীয় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান। ইতালির পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও ভাইরাল ভিডিও বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে।

এই সময় স্থানীয় পুলিশ তাকে ২৪ ঘণ্টা বিশেষ নিরাপত্তা প্রহরা ও পূর্ণ আইনি সহযোগিতা প্রদান করে। ইতালিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস, কনস্যুলেট ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এবং ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
ঢাকায় ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে বাঁধন আক্রমণকারীদের কঠোর ভাষায় হুশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, যারা আমার ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন, তারা আসলে নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে আনছেন। এরা মনে করছে শারীরিক আঘাত করে পার পেয়ে যাবে, কিন্তু এই বর্বরতা বন্ধ হতে হবে। বিদেশের মাটিতে এই ধরনের জঘন্য আচরণে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিদেশিরা ভাববে আমরা জাতিগতভাবেই হয়তো সব জায়গায় মারামারি করি।

বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে তার সক্রিয় সমর্থনের কারণেই তাকে নিশানা করা হয়েছে। হামলাকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রবাসী কর্মী-সমর্থক বলে তিনি চিহ্নিত করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে দলকান রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানান এই অভিনেত্রী। সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা দলকে ভালোবাসতেই পারেন, কিন্তু অন্ধের মতো দলকানা হবেন না। বিদেশের মাটিতে শারীরিক আক্রমণ করে অন্যায় করছেন। দেশের বাইরে আপনারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠান। আজ আপনার বিচার বা সাজা হলে আপনার পরিবারই কষ্ট পাবে, বড় নেতারা কিন্তু দেখতে আসবে না। কারণ নেতারা আরামে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং ভিডিও-অডিও বার্তা দিয়ে আপনাদের উসকে দিচ্ছেন।

একই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকদের উদ্দেশ্যে তিনি পরামর্শ দেন, ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফিরে আসতে হলে কী ধরনের রূপরেখা ও সংস্কৃতি তৈরি করা হচ্ছে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত, যাতে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের লজ্জিত হতে না হয়।
নিজের টিমের ভূমিকায় হতাশা: সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বাঁধন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, এই কঠিন পরিস্থিতিতে সবাই পাশে দাঁড়ালেও তার নিজস্ব সিনেমার টিম তাকে 'ডিজওন' বা অস্বীকার করেছে। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিতব্য টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন। এমন বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও আজমেরী হক বাঁধন এই অন্যায়ের শেষ দেখে ছাড়বেন বলে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
