ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হুমকি উপেক্ষা করেই কম দামে গরুর মাংস বিক্রি করছেন মিরপুরের মাংস বিক্রেতা উজ্জ্বল হোসেন। ৬৩০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করে অন্য ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে পড়েছেন উজ্জল। শাহজাহানপুরের আরেক মাংস ব্যবসায়ী খলিল ৬৫০ টাকা দরে মাংস বিক্রি করায় হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কথা ছিলো ৬৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হবে গরুর মাংস। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে দেয়া সেই কথা এক মাসও বজায় রাখেননি মাংস ব্যবসায়ীরা। রাজধানী জুড়ে এখন গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। জানুয়ারির শুরু থেকে আবারও অদৃশ্য কারণে বেড়েছে গরুর মাংসের দাম। হঠাৎ কেন গরুর মাংসের এই বাড়তি দাম, তার সদুত্তর দিতে পারেননি কোনও বিক্রেতা।
তবে কথা রেখেছেন মিরপুর ১১ নম্বরের লালমাটি এলাকার মাংস ব্যবসায়ী উজ্জল। তিনি মাংস বিক্রি করছেন ৬৩০ টাকায়। লালমাটি এলাকার টেম্পোস্ট্যান্ডে উজ্জ্বল গোশত বিতানে ক্রেতাদের চোখের সামনে গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করছেন বিক্রেতা উজ্জ্বল। সকাল ৭টা থেকে রাত ৯ পর্যন্ত তার দোকানের সামনে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেনীর মানুষই এখন উজ্জলের ক্রেতা।
গেলো শুক্রবার বিক্রি হয়েছে ২৫টি গরু। উজ্জল বলছেন, তিন মাস আগে দিনে দুই থেকে তিনটা গরু জবাই দিতেন। এখন দশ থেকে বারোটি গরু জবাই দিচ্ছেন। তার কৌশলটাও পুরনো। কম লাভ কিন্তু বেশি বিক্রি। আর এটা করতে গিয়ে অন্য ব্যবসায়ীদের প্রতিহিংসার শিকার উজ্জল। হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে তাকে। সাম্প্রতি হুমকি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ কাফনের কাপড় হাতে নিয়ে মাংস বিক্রি করেছেন উজ্জ্বল।

উজ্জ্বল বলেন, খামার ও হাটে গরুর দাম কম। তাই কম দামে মাংস বিক্রি করছি। দাম কম হলেও আমাদের মাংসে কোনো ত্রুটি নেই। দেশি গরু বিক্রি করছি; লাভও করছি ভালো। কিন্তু কম দামে বিক্রি করার কারণে একটি চক্র বারবার হুমকি দিচ্ছে। ব্যাপারী, কিছু সুপার স্টোরের কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও মাংস ব্যবসায়ীদের একটি চক্র আমাকে গরু কিনতে দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, মাংসের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। যা হওয়ার হবে, কাফনের কাপড় হাতে তুলে নিয়েছি, সঙ্গে থাকবে সব সময়। জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে। মরলে মরব, তার পরও সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত করব না। ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, কম দামে মাংস বিক্রি করেও আমরা নিরাপত্তাহীন। মাসখানেক আগে গরুর মাংসের বাজারে অভিযান চালানো হলেও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। মাংসের দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি নেই।
পাশেই আরেক ব্যবসায়ী খোকন শাহ। তিনিও এখন উজ্জলের পথে হাটছেন। বিক্রি বেড়েছে তারও। তিনি বলেন, কমে গরু পাচ্ছি, তাই কমেই খাওয়াচ্ছি। এখন ৭০০ টাকায় মাংস বিক্রি করলে ভোক্তার ওপর জুলুম হবে। গ্রামের অনেক হাট কসাইদের দখলে। তারা বলছে, ৭০০ টাকার ওপরে মাংস বিক্রি করতে না পারলে হাটে আসবি না। অথচ খামার কিংবা হাটে গরুর অভাব নেই।
গরুর দাম কমে যাবার প্রসঙ্গে উজ্জ্বল বলেন, দানাদার খাদ্যের দাম বাড়ায় খামারিরা এখন প্রাকৃতিকভাবে ঘাস চাষে মনোযোগ বাড়িয়েছেন। তাতে তাদের উৎপাদন খরচ অনেকটা কমে গেছে। খামারিদের খরচ কমায় তারা কম দামে গরু বিক্রি করেও সন্তুষ্ট রয়েছেন, বাজারে দামও কমে এসেছে।
গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৫৯৫ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন রাজধানীর শাহজানপুরের মাংস বিক্রেতা খলিল মিয়া। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে ভোক্তা অধিদপ্তর থেকে মাংসের দাম সহনশীল পর্যায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। ফলে দাম ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে আসায় নিম্নআয়ের অনেকেই মাংস কেনেন। এখন তার পাশে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
খলিল বলেন, ক’দিন আগে তাকে ফোন দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। এ সময় হুমকিদাতারা তার ছেলের জন্য ছয় বুলেট, তার জন্য ছয় বুলেট রেখেছে বলে জানান। এছাড়া, তাকে লাশের ছবি পাঠানো হয়। শাহজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সুজিত কুমার সাহা বলেন, হুমকির বিষয়ে থানায় জিডি করেছেন খলিল। বিষয়টি তদন্তে পুলিশের একটি টিম কাজ করছে।
হুট করে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় আবারও নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে গরুর মাংস। বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন ক্রেতারা। তবে, ক্রেতারা মনে করেন, উজ্জল শাহজান কিংবা খোকনের পথ ধরে অন্যরাও দাম কমাতে বাধ্য হবে।
