২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস ও ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করার পর গত ১৮ বছরে তামাক থেকে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ গুণ! একইসঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশে তামাক ব্যবহার প্রায় ১৮ শতাংশ কমেছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করলে কর বৃদ্ধির পাশাপাশি তামাকের ব্যবহার কমে যায়, সেটা প্রমাণিত।
রোববার দুপুরে গুলশানে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির (বিএনটিটিপি) কনফারেন্স রুমে এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
সভায় বক্তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী হলে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে বলে তামাক কোম্পানি প্রচারণা চালাচ্ছে। এটা আদৌ যুক্তিসংগত নয়। এনবিআরের রাজস্ব আহরণের তথ্যই বলে দেয় তারা কতটা মিথ্যাচার করছে। বাংলাদেশে ২০০৫ সালে যখন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়, সে বছর তামাক থেকে রাজস্ব ছিল ২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা।
পরবর্তী অর্থবছর ২০০৫-০৬-এ রাজস্ব আদায় হয় ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে যখন আইনটি সংশোধন হয়, সে বছর তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল ১০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে মোট ৩২ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
বক্তারা আরো বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন হলে দেশে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মিথ্যাচার চালাচ্ছে তামাক কোম্পানি। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুসারে দেশে বিড়ি কোম্পানিতে শ্রমিক নিয়োজিত আছে মাত্র ৪৬ হাজার। আর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে দুই বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানি বিএটিবি ও জেটিআই। তামাক কোম্পানির প্রতিবেদন অনুসারে তাদের কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ১৭৬৯ জন (বিএটিবির ১,৬৬৯ জন এবং জেটিআইয়ের প্রায় ১০০ জন)। অতএব সিগারেট কোম্পানিগুলো ৭০ লাখ লোক কাজ হারাবে বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিইআরের প্রকল্প কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিলের সঞ্চালনায় সভায় বক্তারা আরো বলেন, তামাক কোম্পানি শিশু-কিশোরদের ধূমপানের নেশায় আকৃষ্ট করতে তারা বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ধূমপানের স্থান তৈরি করে দিচ্ছে। বিক্রয়স্থলে আগ্রাসী বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, দেশে ভেপিং ও ই-সিগারেটের ব্যবহার বাড়াতে যুবকদের নিয়ে গোপনে ভেপিং মেলার আয়োজন করছে, যা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধূমপানে আসক্ত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ধ্বংসের পাঁয়তারা।
তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিসের মতো রোগ বেড়েই চলেছে। এসব রোগের চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে, প্রতি বছর দেশের প্রায় ৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। এই তথ্যগুলো সিগারেট কোম্পানি আড়াল করতে চায়। সিগারেট কোম্পানির এই ভ্রান্ত প্রচারণা থেকে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকা এবং দেশের তরুণদের স্বাস্থ্যরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান বক্তারা।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আলোচ্য বিষয়ের ওপর মতামত দেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন, বিইআরের ফোকাল পার্সন ও বিএনটিটিপির কনভেনর অধ্যাপক ড. রুমানা হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিইআরের প্রকল্প ব্যবস্থাপক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মহিউদ্দীন ফারুক এবং বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী হেলাল আহমেদ।
এছাড়া প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নিখিল ভদ্র, একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ সুশান্ত সিনহা এবং দৈনিক শেয়ার বিজ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ।
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র কারিগরি পরামর্শক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিনসহ তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকর্তারা।
রিয়াকে নির্যাতনের ঘটনায় মানবাধিকার কমিশনের সুয়োমটো