দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া সুমনের মধ্যে মেয়েলি আচরণ দেখে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেয় পরিবার। বাড়ির বড় ছেলের স্বভাব ছোটবেলা থেকেই মেয়েলি হওয়ায় বন্ধ হয় বাড়ির ভাত ও দরজা। পরে সুমন থেকে সুমনা হয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে স্টেট এলজিবিটি টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর দেখা যায়, সফল হয়েছেন তিনি।
মাধ্যমিক দিয়েই, করিমপুর ছেড়ে কৃষ্ণনগরে চলে আসেন সুমনা। প্রথমে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকলেও, সেই সুখ বেশিদিন টেকেনি। ক্লাস ১২ থেকেই নিজের ভাত নিজে জোগাড় করে নিতে শুরু করেন সুমনা। তারই সঙ্গে চলতে থাকে পড়াশোনা। টিউশন পড়িয়ে সেই পয়সায় নিজের খাওয়া-থাকার খরচ থেকে শুরু করে লেখাপড়া করেছেন সবই। যদিও সুমনা জানান বলেন, তার কঠিন এই সময়ে পাশে পেয়েছেন কিছু ভালো মানুষকে।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হলেন কলেজে। ছোটবেলা থেকেই অংক করতে খুব ভালোবাসতেন সুমনা। তাই ঠিক করলেন অংককেই জীবনের পাথেয় করে এগিয়ে যাবেন। অংকতেই স্নাতক হন তিনি।

এদিকে সেই সময় চলছে জীবনের চরম লড়াই। ছোটবেলা থেকেই নিজের মধ্যে যে নারী সত্তা ছিলো, সে যে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা তা ক্লাস ৯ থাকতেই বুঝতে পেরেছিলেন সুমন। বাইরে থেকে পুরুষ হলেও তার মন যে আসলে নারীর মতোই, তা বুঝতে পারেন সুমন। কলেজে উঠেই সিদ্ধান্ত নেন আর নয়, এবার বাস্তবেই সুমনা হয়ে উঠবেন তিনি।
তখনই জীবনে আরও একবার ধাক্কা খেতে হল সুমনাকে। যে শিক্ষিকা, কোনো টাকা ছাড়াই এতদিন টিউশন পড়াতো তার কাছেও চরম অপমানিত হতে হলো সুমনাকে। সুমনার নারী সত্তাকে সমাজের আরও অনেকের মতোই ‘মানসিক রোগ’ বলে দেগে দিলেন তিনিও।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে অংক নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা শুরু করেন সুমনা। এমনকি ট্রান্সজেন্ডার হিসাবে প্রথম অংকে গোল্ড মেডেল পান সুমনা।
স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা শেষ করার পর বিএড করেন। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় সেট পরীক্ষা দেওয়া। দীর্ঘ পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় অবশেষে সম্প্রতি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন সুমনা। এরই সঙ্গে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ‘ইনভাইটেড লেকচারার’ হিসেবে কলেজে পড়ান তিনি। শুধু পড়াশোনাই নয়, এর সঙ্গে তার হাতের কাজও দুর্দান্ত। মাটির মূর্তি বানাতে অত্যন্ত পটু তিনি। নিজের হাতেই তৈরি করেন দারুণ দারুণ মূর্তি। ট্রান্সজেন্ডার হিসাবেই একদিনের জন্য লোক আদালতের বিচারকের পদ পেয়েছিলেন সুমনা।
সুমনা বলেন, আজ আমার সাফল্য দেখে অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কিন্তু খারাপ সময় তারাই কেউ পাশে ছিলেন না। ট্রান্সজেন্ডার হিসাবে খারাপ সময়ে চাইলেই আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করার পথ বেছে নিতে পারতাম, বা অন্য কোনো পথে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে লড়াই করে আজ এই জায়গায় এসেছি। আমার পথ মোটেও সহজ ছিলো না। এটা সমাজের সেই সব মানুষদের গালে একটা চর, যারা বলেছিল নারী হতে চাওয়া আমার মানসিক রোগ।
প্রেমের জীবনেও বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে সুমনাকে। বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে পুরুষরা হয়তো তার দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন বারবার, কিন্তু কেউই মন বোঝার চেষ্টা করেন না।
খানিকটা আক্ষেপের সুরেই সুমনা বলেন, জীবনে যতবার ভালোবাসা এসেছে, আমি ভুল মানুষকেই বেছে নিয়েছি।
এখন সেট পরীক্ষায় সাফল্যের পরে নিজের কেরিয়ার নিয়েই বেশি ব্যস্ত সুমনা। তিনি বলেন, ট্রান্সজেন্ডাররা যে শুধু ভিক্ষে করে না তা প্রমাণ করতেই আরও অনেকটা পথ হাঁটতে চাই। আমার মনে হয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা ভীষণ জরুরি।
ইসরাইলকে বিধ্বংসী এমকে-৮৪ বোমা দিলো আমেরিকা