আবারও উত্তপ্ত লোহিত সাগর। ইয়েমেনের হোদেইদা উপকূলে সোমবার একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে বন্দুকধারীরা। হামলায় দুই জন ক্রু সদস্য নিহত হয়েছে এবং আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে দুবাই থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। গেলো ২৪ ঘন্টার মধ্যে লোহিত সাগরে দ্বিতীয় জাহাজটি হামলার শিকার এটি।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের এক বৈঠকে লাইবেরিয়ার একটি প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, গ্রিসের পরিচালিত এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ইটারনিটি-সি কার্গো জাহাজে গুলি, রকেট ও দূরনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরকভর্তি নৌকা ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এতে দুই নাবিক নিহত হয়েছেন।
এর আগে, ইয়েমেনের হুথিরা গত রোববারের একটি হামলার দায় স্বীকার করেছিল, যেখানে লোহিত সাগরে স্কিফের (ছোট নৌকা) বন্দুকধারীরা একটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়ে, রকেট চালিত গ্রেনেড হামলা ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যেতে বাধ্য করে। কয়েক মাসের মধ্যে এই ঘটনাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর প্রথম হুতি আক্রমণ।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রে সোমবার জানিয়েছে, লোহিত সাগরে উত্তর দিকে যাওয়ার সময় লাইব্রেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাল্ক ক্যারিয়ারের দিকে দুটি স্কিফ (ছোট নৌকা) ও ড্রোন আক্রমণ করে। স্কিফগুলো জাহাজের ওপর গুলি চালায় বলে জানা গেছে এবং জাহাজের আর্মড সিকিউরিটি টিম পাল্টা গুলি চালায়। এ সময় দুই ক্রু আহত ও আরো দুই ক্রু নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।
লাইবেরিয়ান জাহাজ প্রতিনিধি দলের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনের পর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ইটারনিটি সি-তে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পর লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে হামলায় নিহত নাবিকের সংখ্যা ছয় জনে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে সোমবার হুতিরা জানিয়েছে, রোববার তারা বিস্ফোরক ভরা দূরনিয়ন্ত্রিত নৌকা, রকেট দিয়ে আঘাত হেনে ও গুলিবর্ষণ করে মালবাহী জাহাজটি ডুবিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলতি বছর এটি তাদের প্রথম হামলা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাহাজটির গ্রিক পরিচালনা কোম্পানি স্টেম শিপিং রয়টার্সকে বলেছে, তারা স্বতন্ত্রভাবে বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি। জাহাজটি ডুবে গেছে কি না, রয়টার্সও তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি।

হতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিবৃতিতে জানান, জাহাজটির ক্রুরা তাদের নৌবাহিনীর সতর্কবার্তা ও কল উপেক্ষা করার পর জলযানটিতে হামলা চালানো হয়। জাহাজটি ডুবিয়ে দিতে মানুষবিহীন দুটি নৌকা, পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ও তিনটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কিংডম ম্যারিটাইম ট্রেড অপারেশন্স এবং ব্রিটিশ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আমব্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে আটটি ছোট বোট থেকে জাহাজটিকে (ম্যাজিক সিজ) লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, এরপর স্ব-চালিত গ্রেনেড ছোড়া হয়। জাহাজটির সশস্ত্র রক্ষীরা এর জবাব দেয়।
এর কিছুক্ষণ পর মানুষবিহীন চারটি দূরনিয়ন্ত্রিত নৌকা ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জাহাজটিতে আঘাত হানা হয়। হুতিরা জানিয়েছে, তারা ডুবে যাওয়া লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘ম্যাজিক সিজ’ এর ১৯ নাবিককে জাহাজটি ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়। স্টেম শিপিং জানিয়েছে, পাশ দিয়ে যেতে থাকা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ সব ক্রুকে উদ্ধার করেছে এবং তাদের জিবুতিতে নামিয়ে দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সোমবার জানিয়েছে, লোহিত সাগরে ম্যাজিক সিজ হামলার শিকার হওয়ার পর তাদের পাঠানো সাহায্যের আবেদনে সাড়া দেয় এডি পোর্টস গ্রুপের জাহাজ ‘সাফিন প্রিজম’ আর ওই জাহাজে থাকা ২২ জনের সবাইকে সফলভাবে উদ্ধার করে। ম্যাজিক সিজে থাকা ওই ২২ জনের মধ্যে ১৯ জন ক্রু ও বাকি তিনজন সশস্ত্র রক্ষী বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
ইসরাইল ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার ঘটনাটি ঘটে। এর মধ্যদিয়ে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং রুট লোহিত সাগরে ছয় মাস ধরে চলা শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটল। হুতি বলে আসছে, যতদিন গাজা যুদ্ধ চলবে ততদিন পর্যন্ত ইসরাইল সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা হবে।
হুতি বিদ্রোহীরা তখন দাবি করেছিলেন, তাঁরা গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং এই দুইয়ের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ১০০-এর বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছেন। তবে চলতি বছর এই ধরনের হামলা বন্ধ ছিল। সর্বশেষ হামলার ঘটনা ঘটেছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।
